নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৯:০৩, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরু

আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরু

ফাইল ছবি

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে অনিয়ম এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। 

বুধবার (০২ সেপ্টেম্বর) দুদকের জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 

দুদক জানিয়েছে, অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পরই অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভিযোগগুলো যাচাই করতে উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি বিশেষ অনুসন্ধান টিমও গঠন করা হয়েছে।

অনুসন্ধানের আওতায় থাকা অপর তিন ব্যক্তি হলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্ম সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জুবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদ। দুদকের গঠিত টিমের অন্য সদস্যরা হলেন সহকারী পরিচালক মো. নাছরুল্লাহ হোসাইন এবং উপসহকারী পরিচালক ইমরান আকন ও রোমান উদ্দিন। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনুসন্ধানে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, বদলি-পদায়নের নথি, নিয়োগ ও পদোন্নতির কার্যক্রম, সরকারি কেনাকাটা এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন যাচাই করা হবে।

দুদকের অনুসন্ধানের কেন্দ্রে রয়েছে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বদলি ও পদোন্নতিকে ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ। 

দুদকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করে নতুন করে পদায়নের আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রায় ৭৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পদোন্নতির পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পছন্দের স্থানে পদায়নের জন্য আরও প্রায় ২ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এই তিনটি অভিযোগের অঙ্ক যোগ করলে তা প্রায় ৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই ঘটনাকে মোট ১৮৮ কর্মকর্তাকে ঘিরে বদলি-পদোন্নতি বাণিজ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগের বিষয়টি কেবল বদলি ও পদোন্নতিতে সীমাবদ্ধ নয়। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন টেন্ডার ও সরকারি কেনাকাটায় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে। 

অভিযোগে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা এবং অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি চক্র গড়ে উঠেছিল, যারা বদলি, পদোন্নতি, পদায়ন ছাড়াও টেন্ডার ও কেনাকাটার কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করত। দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে কয়েকজন যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার নামও এসেছে। তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ এখনো অনুসন্ধানাধীন এবং অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে এমন কোনো সিদ্ধান্ত দুদক দেয়নি।

বুধবার বিকেলে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম জানান, নিয়োগ, বদলি ও সরকারি কেনাকাটায় সিন্ডিকেটভিত্তিক অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য চার সদস্যের টিম গঠন করা হয়েছে। 

তার বক্তব্য অনুযায়ী, আসিফ মাহমুদ ও অপর তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে বিষয়টি এখন প্রাথমিক অভিযোগ যাচাইয়ের পর্যায় অতিক্রম করে বিস্তারিত অনুসন্ধানের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই অনুসন্ধানে নথিপত্র সংগ্রহ, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণ এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাইয়ের মতো কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথা রয়েছে।

অভিযোগের আরেকটি বিস্তৃত অংশে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বেআইনি কাজ হাসিলের জন্য ঘুষ গ্রহণ, মানিলন্ডারিং, বিদেশে অর্থপাচার এবং অননুমোদিত বিটকয়েন লেনদেনের মতো গুরুতর অভিযোগের কথাও বিভিন্ন সূত্রের বরাতে প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি, স্বজনপ্রীতি এবং আঞ্চলিক প্রভাব ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ থাকার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে দুদকের প্রকাশ্য বক্তব্যে এখন পর্যন্ত বিস্তারিত প্রমাণ বা আর্থিক হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এগুলোকে অনুসন্ধানাধীন অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: গ্রেফতারের ক্ষমতা পাচ্ছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কার্যক্রম ও গঠনপ্রক্রিয়ায় আসিফ মাহমুদের সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগও দুদকের কাছে এসেছে বলে কয়েকটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া তার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ে প্রভাব বিস্তার এবং অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগের কথাও উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে বর্তমান চারজনের বিরুদ্ধে গঠিত অনুসন্ধান টিমের আনুষ্ঠানিক কার্যপরিধি কতটা বিস্তৃত, সে বিষয়ে দুদক বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেনি।

মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঘিরে এর আগে দুদকের পৃথক অনুসন্ধানও হয়েছিল। ২০২৫ সালে ক্ষমতার অপব্যবহার, তদবির-বাণিজ্য, টেন্ডার-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাকে দুদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রায় ১১ মাসের অনুসন্ধানের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুদক অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে সেই অনুসন্ধান পরিসমাপ্ত করে। পরবর্তীতে সিআইডির পৃথক অনুসন্ধানের বিষয়টি সামনে আসে। অর্থাৎ, মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে আগের দুদক অনুসন্ধানের ফলাফলকে বর্তমান আসিফ মাহমুদসহ চারজনের অনুসন্ধানের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; দুটি বিষয়কে পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে।

এদিকে দুদকের অনুসন্ধানের খবর প্রকাশের পর আসিফ মাহমুদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি দুদকের কাছে অভিযোগের প্রমাণ জনসম্মুখে প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যের সারকথা হলো দুদক যেসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতার কথা বলছে, সেসবের প্রমাণ জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হোক। তিনি এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত কথা বলবেন বলেও জানিয়েছেন।

দুদকের অনুসন্ধানকে ঘিরে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে ১৮৮ কর্মকর্তার বদলি, পদোন্নতি ও পদায়নে যে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে, তার সঙ্গে অভিযুক্ত চারজনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা কী ছিল এবং অর্থের প্রকৃত প্রবাহ কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে। অনুসন্ধান টিম এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, পদায়ন ও পদোন্নতির আদেশ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি কেনাকাটা ও টেন্ডার কার্যক্রমে অভিযোগ করা সিন্ডিকেটের ভূমিকা থাকলে তার পরিধিও নির্ধারণ করা হবে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৮৮ কর্মকর্তাকে ঘিরে যে তিনটি আর্থিক অভিযোগের কথা সামনে এসেছে, সেগুলোর মধ্যে ৭৬ লাখ টাকা, ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং প্রায় ২ কোটি টাকার পৃথক লেনদেনের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, শুধু এই তিনটি অভিযোগেই মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা। কিছু সংবাদ প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে ৪ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বাইরে টেন্ডার, কেনাকাটা ও অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সেগুলোর আর্থিক পরিমাণ দুদকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দিষ্ট করা হয়নি।

তবে অনুসন্ধানের এই পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুদকের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া বলতে অভিযোগের কিছু ভিত্তি বা অনুসন্ধান চালানোর মতো উপাদান পাওয়া বোঝায়; এটি আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে চূড়ান্তভাবে দুর্নীতির দায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সমতুল্য নয়। অনুসন্ধান শেষ হওয়ার পর সংগৃহীত নথি, সাক্ষ্য, আর্থিক তথ্য ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। দুদকও জানিয়েছে, অনুসন্ধান টিমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফলে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ও মন্ত্রণালয়ের তিন কর্মকর্তাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের পরবর্তী গতিপথ এখন নির্ভর করছে দুদকের বিস্তারিত অনুসন্ধানের ওপর। বিশেষ করে ১৮৮ কর্মকর্তার বদলি-পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, সরকারি টেন্ডার ও কেনাকাটায় কথিত সিন্ডিকেটের ভূমিকা এবং অভিযোগে উত্থাপিত অন্যান্য আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে কী তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়, সেটিই নির্ধারণ করবে অনুসন্ধানটি শেষ পর্যন্ত কোন পর্যায়ে গড়ায়।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়