স্পোর্টস ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৯:৪৭, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিদেশের মাটিতে হৃদয়ের ঐতিহাসিক ট্রিপল সেঞ্চুরি

বিদেশের মাটিতে হৃদয়ের ঐতিহাসিক ট্রিপল সেঞ্চুরি

ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে তাওহীদ হৃদয় লিখলেন বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের নতুন এক অধ্যায়। দক্ষিণ আফ্রিকা এ দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ এ দলের হয়ে চার দিনের ম্যাচে ক্যারিয়ারের প্রথম ট্রিপল সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন ডানহাতি এই ব্যাটার। এর মধ্য দিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বিদেশের মাটিতে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের প্রথম ত্রিশতকের কীর্তি গড়েছেন তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৩০০ বা তার বেশি রানের ইনিংস খেলা তৃতীয় ব্যাটার হয়েছেন হৃদয়। এর আগে এই কীর্তি ছিল কেবল রকিবুল হাসান ও তামিম ইকবালের। 

২০০৬-০৭ মৌসুমে বরিশাল বিভাগের হয়ে সিলেট বিভাগের বিপক্ষে ৩১৩ রান করে দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রথম ট্রিপল সেঞ্চুরিয়ান হয়েছিলেন রকিবুল। পরে ২০১৯-২০ মৌসুমে বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে ইস্ট জোনের হয়ে সেন্ট্রাল জোনের বিপক্ষে অপরাজিত ৩৩৪ রান করে সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যান তামিম ইকবাল। এবার তাদের পাশে নিজের নাম যুক্ত করলেন হৃদয়।

পচেফস্ট্রুমের সেনওয়েস পার্কে দক্ষিণ আফ্রিকা এ দলের ৫১২ রানের জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুরুটা অবশ্য বাংলাদেশের জন্য স্বস্তিদায়ক ছিল না। একের পর এক উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় সফরকারীরা। সেই পরিস্থিতিতে দলের ভার নিজের কাঁধে তুলে নেন অধিনায়ক হৃদয়। প্রথমে জাকের আলীকে সঙ্গে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে ইনিংসের ভিত শক্ত করেন তিনি। পরে নিচের সারির ব্যাটারদের নিয়েও ধৈর্য ধরে ব্যাটিং চালিয়ে যান। ম্যাচের দ্বিতীয় দিন শেষে বাংলাদেশ এ দলের সংগ্রহ ছিল ২০১ রানে ৪ উইকেট, তখন হৃদয় ৭৫ রানে অপরাজিত ছিলেন এবং জাকের আলী ছিলেন ৪৭ রানে অপরাজিত। এরপর মঙ্গলবার ইনিংসকে আরও বড় করে ২০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। ১৯৮ থেকে ১৯৯-এ পৌঁছানোর পর দ্বিতীয় রান নিতে না পারায় ডাবল সেঞ্চুরির অপেক্ষা কিছুটা দীর্ঘ হলেও শেষ পর্যন্ত বাউন্ডারি মেরে ২০০ পেরিয়ে যান হৃদয়। এটি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার দ্বিতীয় ডাবল সেঞ্চুরি; এর আগে ২০২২ সালের বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে প্রথমবার এই মাইলফলক স্পর্শ করেছিলেন তিনি।

চতুর্থ ও শেষ দিনে ২০৪ রানে অপরাজিত থেকে ব্যাটিং শুরু করেন হৃদয়। লক্ষ্য তখন শুধু ত্রিপল সেঞ্চুরি নয়, দলের জন্য যতটা সম্ভব বড় সংগ্রহ নিশ্চিত করা। ২১৮ রান পার করার মধ্য দিয়ে তিনি ভেঙে দেন বাংলাদেশ এ দলের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের পুরোনো রেকর্ড। ২০০৩ সালে করাচিতে ডিফেন্স হাউজিং কমিটির বিপক্ষে ২১৮ রান করেছিলেন শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুৎ। এতদিন সেটিই ছিল বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশ এ দলের কোনো ব্যাটারের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস এবং এ দলের হয়ে একমাত্র ডাবল সেঞ্চুরি। হৃদয় সেই রেকর্ড পেরিয়ে যাওয়ার পরও থামেননি। রেজাউর রহমান রাজাকে সঙ্গে নিয়ে নিচের দিকের ব্যাটিংকে কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়ে ইনিংস টেনে নিয়ে যান তিনি। লাঞ্চ বিরতির সময় বাংলাদেশ এ দলের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৮ উইকেটে ৫৭৬ রান, হৃদয় তখন অপরাজিত ২৭৪। এরপর ধীরে ধীরে ৩০০-এর দিকে এগিয়ে যান তিনি।

আরও পড়ুন: দক্ষিণ আফ্রিকা এ দলের বিপক্ষে হৃদয়ের ডাবল সেঞ্চুরি

শেষ পর্যন্ত ৪৫১ বল মোকাবিলা করে স্বপ্নের ত্রিশতক পূর্ণ করেন হৃদয়। দক্ষিণ আফ্রিকার পেসার ম্যাথু বোস্টের বল মিড-অনের দিকে ঠেলে দিয়ে দ্রুত দুই রান নিয়ে মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। তার ইনিংসে ছিল ২৫টি চার ও ৬টি ছক্কা। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় উইকেটে থাকার পাশাপাশি প্রয়োজনমতো আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়েরও পরিচয় দিয়েছেন এই ব্যাটার। তার ট্রিপল সেঞ্চুরি পূর্ণ হওয়ার সময় বাংলাদেশ এ দলের সংগ্রহ ছিল ৮ উইকেটে ৬১১ রান এবং দলটি দক্ষিণ আফ্রিকা এ-র প্রথম ইনিংসের ৫১২ রানের জবাবে ৯৯ রানের লিডে ছিল; ম্যাচের পরবর্তী আপডেটে বাংলাদেশের সংগ্রহ আরও বাড়ে।

হৃদয়ের এই ইনিংসের মাহাত্ম্য শুধু বাংলাদেশের রেকর্ডেই সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে কোনো বিদেশি ব্যাটারের ট্রিপল সেঞ্চুরি করার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। হৃদয়ের আগে দেশটির প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বিদেশি ব্যাটার হিসেবে ৩০০ রানের ইনিংস ছিল ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি ডেনিস কম্পটনের। ১৯৪৮-৪৯ মৌসুমে এমসিসির হয়ে তিনি ৩০০ রান করেছিলেন। ফলে হৃদয় দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ট্রিপল সেঞ্চুরি করা মাত্র দ্বিতীয় বিদেশি ব্যাটার হিসেবেও রেকর্ডবুকে জায়গা করে নিয়েছেন।

তাওহীদ হৃদয়ের এই কীর্তির সঙ্গে পচেফস্ট্রুমের মাঠটিরও রয়েছে বিশেষ আবেগের যোগসূত্র। ২০২০ সালে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিশ্বকাপজয়ী অভিযানের অন্যতম সদস্য ছিলেন হৃদয়। সেই বিশ্বকাপের ফাইনালসহ বাংলাদেশের শিরোপা জয়ের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে পচেফস্ট্রুম। ছয় বছর পর একই শহরের মাঠে ফিরে এবার জাতীয় দলের কাছাকাছি পর্যায়ের এ দলের হয়ে ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ইনিংসটি খেললেন তিনি। ২০২০ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটে প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা, আর সেই দলের সহ-অধিনায়ক ছিলেন হৃদয়।

সব মিলিয়ে পচেফস্ট্রুমে হৃদয়ের ব্যাটে লেখা হলো একসঙ্গে একাধিক ইতিহাস। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম প্রথম শ্রেণির ট্রিপল সেঞ্চুরি, প্রথম শ্রেণিতে বাংলাদেশের তৃতীয় ত্রিশতক, বাংলাদেশ এ দলের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বিদেশি ব্যাটার হিসেবে মাত্র দ্বিতীয় ট্রিপল সেঞ্চুরি এক ইনিংসেই এতগুলো অর্জন যুক্ত হয়েছে তার নামের পাশে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যক্তিগত মাইলফলকের পাশাপাশি ইনিংসটি এসেছে দলের প্রয়োজনের মুহূর্তে। ৫১২ রানের বড় স্কোর করা দক্ষিণ আফ্রিকা এ দলকে জবাব দিতে নেমে শুরুতে বিপাকে পড়া বাংলাদেশ এ দলকে দীর্ঘ সময় ব্যাটিং করে ম্যাচে শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছেন অধিনায়ক হৃদয়। তার ব্যাটে তাই পচেফস্ট্রুমের এই ত্রিশতক কেবল ব্যক্তিগত রেকর্ডের গল্প নয়; বাংলাদেশের এ দলের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ইতিহাসেও এটি হয়ে থাকল অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়