‘বাপেক্সকে পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল’
ছবি: সংগৃহীত
বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) সুপরিকল্পিতভাবে পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, পর্যাপ্ত দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান না করে অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা সৃষ্টির ফলেই আজ দেশে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট ও নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বুধবার (০২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের তৃতীয় দিনে সংসদ সদস্যদের মৌখিক উত্তরদান পর্বে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই প্রশ্নোত্তর পর্বে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহতকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার সুদূরপ্রসারী রূপরেখা তুলে ধরেন তিনি।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমান জ্বালানি সংকট থেকে দেশকে স্থায়ীভাবে মুক্ত করতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে দেশজুড়ে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যে ৩০টি কূপের খননকাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ১৪০ থেকে সাড়ে চার শ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) নতুন গ্যাস যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে আরও ৭টি কূপের খননকাজ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে, যা শেষ হলে গ্রিডে অতিরিক্ত ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এছাড়া বাকি কূপগুলো পর্যায়ক্রমে খননের জন্য নতুন নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে ৪,৫০০ থেকে ৫,৬০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক সার্ভে এবং ৪,২০০ বর্গ কিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার বৃহৎ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে আগের দুর্বল অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে এবং শক্তিশালী ও সক্ষম করে তুলতে আধুনিক প্রযুক্তির নতুন দুটি রিগ ক্রয়ের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে সংসদকে জানান প্রধানমন্ত্রী।
আরও পড়ুন: তারেক রহমানের সঙ্গে শিগগির সাক্ষাৎ চান ট্রাম্প
জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার অফশোর ও অনশোর মডেল পিএসসি (প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্যাক্ট)-এর আওতায় ব্যাপকভিত্তিক অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে। ইতোমধ্যে অফশোর মডেল পিএসসি-২০২৬ অনুমোদনের পর আন্তর্জাতিক বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে এবং অনশোর মডেল পিএসসি অনুমোদনের প্রক্রিয়াও বর্তমানে শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সামুদ্রিক এলএনজি অবকাঠামো আরও সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে কুতুবজোমে একটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়ে আগ্রহী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা চলছে।
আশা করা হচ্ছে, ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই টার্মিনাল থেকে রিগ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে, যার ফলে আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের এলএনজি আমদানি ক্ষমতা আরও ৬০০ এমএমসিএফডি বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল কিংবা পায়রা ও মোংলা বন্দর এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে আরও এক থেকে দুটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও চলছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ব্যাপকহারে বাড়াতে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসাহ তৈরি করতে চলতি বছরের ৮ জুন এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারিসহ সব প্রয়োজনীয় উপাদানের ওপর থেকে কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর এবং অতিরিক্ত অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিশেষ করে রুফটপ সোলার প্যানেল স্থাপনকারীদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক ও আকর্ষণীয় আর্থিক মডেল ঘোষণা করেছে সরকার। আগামী ছয় মাসের মধ্যে যারা বাসাবাড়ি বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ছাদে সোলার স্থাপন করবেন, তাদের উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০.১৫ টাকা দরে কিনে নেবে। বর্তমান বাজারে গ্রিডের গড় উৎপাদন খরচ প্রতি ইউনিট ৬ থেকে ৭ টাকা হওয়ার বিপরীতে এই বিশেষ বাল্ক রেট ও সরকারি প্রণোদনার ফলে উদ্যোক্তারা ৪০ শতাংশ মুনাফা ও ৫ শতাংশ প্রিমিয়ামসহ প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত নিট মুনাফা অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ পাবেন, যা পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
এছাড়া দেশের সকল সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালে সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য একটি সর্বাত্মক জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের প্রতিটি জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে রুফটপ সোলার সফলভাবে স্থাপন করা হয়েছে এবং অন্যান্য সরকারি দপ্তরেও এটি বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। সোলারের পাশাপাশি বায়ু বিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বহুমুখী ও সমন্বিত পরিকল্পনাও সরকারের টেবিলে সক্রিয় রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








