নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৯:১১, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তারেক রহমানের সঙ্গে শিগগির সাক্ষাৎ চান ট্রাম্প

তারেক রহমানের সঙ্গে শিগগির সাক্ষাৎ চান ট্রাম্প

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অদূর ভবিষ্যতে সরাসরি সাক্ষাতের প্রত্যাশা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উষ্ণ শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানিয়েছেন তিনি এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সামনে খুব উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। 

সোমবার (৩১ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রীকে পাঠানো এক চিঠিতে এসব কথা জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। 

চিঠিতে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত এই তিনটি বিষয়ই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

চিঠির শুরুতেই ডোনাল্ড ট্রাম্প বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন। 

তিনি জানান, বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পাঠানো চিঠি তিনি পেয়েছেন এবং এ সিদ্ধান্তের জন্য তাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আশ্বস্ত করে বলেন, বোয়িং আপনাকে হতাশ করবে না। একই সঙ্গে তিনি বিষয়টির প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত মনোযোগের জন্যও ধন্যবাদ জানান। এ সিদ্ধান্তকে তিনি যে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন, তার ইঙ্গিত দিয়ে চিঠিতে উল্লেখ করেন, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মনোযোগের কথা তিনি ভুলবেন না।

এরপর বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের আশাবাদের কথা জানান ট্রাম্প। চিঠিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ অনেক কিছু সহ্য করেছে এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও এ দেশের জনগণের সামনে একটি খুব উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের কাছে তার উষ্ণ শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা পৌঁছে দিতে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন তিনি। চিঠির শেষাংশে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও দেশের জনগণের জন্য শুভকামনাও জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

চিঠির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তাগুলোর একটি এসেছে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের সম্ভাব্য সরাসরি বৈঠক প্রসঙ্গে। 

ট্রাম্প লিখেছেন, তিনি অদূর ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের অপেক্ষায় রয়েছেন। অর্থাৎ, দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের যোগাযোগকে আরও দৃশ্যমান ও সরাসরি পর্যায়ে নেওয়ার আগ্রহের কথাই চিঠিতে তুলে ধরেছেন তিনি। তবে সম্ভাব্য বৈঠকের স্থান, তারিখ বা সময় সম্পর্কে চিঠিতে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।

ট্রাম্পের এই চিঠির আগে থেকেই বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক নিয়ে ধারাবাহিক যোগাযোগ চলছিল। গত ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে চিঠি দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার ও গভীর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী তখন যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও উন্নয়নযাত্রার দীর্ঘদিনের বন্ধু ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সহযোগিতার জন্যও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চিঠিতে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার পেছনে সাম্প্রতিক বিমান ক্রয়-সংক্রান্ত আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি বিমান কেনার চুক্তি করে। চুক্তিতে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স উড়োজাহাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি বিমান বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উড়োজাহাজ ক্রয়াদেশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এর তালিকামূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: বহুদলীয় গণতন্ত্রই নয়, সংসদীয় গণতন্ত্রও বিএনপির হাত ধরে এসেছে

তবে ৩০ আগস্ট মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের পর বোয়িং ক্রয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়। গোর দাবি করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলতি সপ্তাহে একটি অসাধারণ চুক্তি করেছেন এবং বাংলাদেশ আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। 

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের আগের প্রাথমিক ক্রয়াদেশও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হবে। তবে তিনি অতিরিক্ত কতটি উড়োজাহাজ কেনা হবে, কোন মডেলের বিমান হবে, মোট আর্থিক মূল্য কত কিংবা নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক ক্রয়চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে কি না এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি।

সার্জিও গোরের ওই বক্তব্যের পর নতুন করে কোনো বোয়িং চুক্তি হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ১ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, গোরের মন্তব্যটি বাংলাদেশের সঙ্গে আগে সম্পন্ন হওয়া বোয়িং চুক্তিকে নির্দেশ করে থাকতে পারে। 

তিনি জানান, নতুন করে আলাদা কোনো চুক্তি হয়েছে কি না এ বিষয়ে গোরের বক্তব্যকে আগের চুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবেও দেখা যেতে পারে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, ১৪টি উড়োজাহাজের চুক্তির বাইরে আলাদা কোনো বোয়িং ক্রয়চুক্তি স্বাক্ষরের তথ্য তাদের কাছে নেই। ফলে ট্রাম্পের চিঠিতে বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তের প্রশংসা এবং গোরের নতুন চুক্তি সংক্রান্ত বক্তব্যকে এক করে নিশ্চিত নতুন ক্রয়াদেশ হিসেবে উপস্থাপন না করে বিষয়টি নিয়ে সরকারি ব্যাখ্যাও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও জানিয়েছেন, বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের কোনো চাপের কারণে নেওয়া হয়নি; বরং বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতের প্রয়োজন বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, আন্তর্জাতিক নতুন রুট চালু, যাত্রী পরিবহন ও আয় বাড়ানো এবং বাংলাদেশকে এশিয়ার একটি আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করতে দেশের উড়োজাহাজ বহর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো প্রয়োজন। 

তিনি বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ ভবিষ্যতেও অতিরিক্ত উড়োজাহাজ কিনতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার নীতির কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণ করতে চায় ঢাকা।

বোয়িং ক্রয়ের বিষয়টি বাংলাদেশের বৃহত্তর বিমান খাতের সম্প্রসারণ পরিকল্পনার সঙ্গেও যুক্ত। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জাতীয় পতাকাবাহী বিমানকে আরও সক্ষম ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পাশাপাশি নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু, দীর্ঘপথের ফ্লাইট সক্ষমতা বাড়ানো এবং ঢাকাকে আঞ্চলিক বিমান চলাচলের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। সরকারের এভিয়েশন খাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বগুড়ায় পাইলট প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে। পাশাপাশি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতিও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

সার্জিও গোরের বাংলাদেশ সফরও সাম্প্রতিক ঢাকা-ওয়াশিংটন যোগাযোগের ধারাবাহিকতায় গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ৩০ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে দুই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সফরের সময় তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরও পরিদর্শন করেন। মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, সফরটি বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বিস্তৃত পরিসর ও গভীরতাকে তুলে ধরেছে।

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের সর্বশেষ চিঠিকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রকাশ্যে আশাবাদ জানিয়েছেন, অন্যদিকে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি ব্যক্তিগত শুভেচ্ছা ও ভালোবাসার কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে দুই দেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়টিও সামনে এনেছেন। এর সঙ্গে অদূর ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের প্রত্যাশা প্রকাশ করায় ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায়ের সম্ভাব্য রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়েও নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে সেই বৈঠকের সময়সূচি কিংবা বোয়িং নিয়ে গোরের উল্লেখ করা সম্ভাব্য অতিরিক্ত ক্রয়াদেশের সুনির্দিষ্ট আকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়