‘বাংলাদেশ ফার্স্ট নীতি মেনেই মক্কা চুক্তির বিষয়টি যাচাই করবে সরকার’
ফাইল ছবি
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের উদ্যোগে গঠিত বহুল আলোচিত মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট বা মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান এবং এর বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় ঐতিহাসিক সাফফা প্রাসাদে সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে এই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মূল ভিত্তি হলো সদস্য দেশগুলোর যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সব সদস্য দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কেউ কেউ এই ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তাবেষ্টনীকে মুসলিম ন্যাটো হিসেবেও অভিহিত করছেন।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা ও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন যে, কোনো বহুপক্ষীয় সংস্থায় বা জোটে যুক্ত হওয়ার আগে বর্তমান সরকারের অনুসৃত বাংলাদেশ ফার্স্ট বা আগে বাংলাদেশ বৈদেশিক নীতির আলোকে বিষয়টি গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে।
মঙ্গলবার (০১ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, এই জোটে যুক্ত হলে বাংলাদেশের এবং এ দেশের মানুষের কী ধরনের সুবিধা ও লাভ আসবে, তা চুলচেরা বিশ্লেষণ করেই সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
চুক্তিতে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান যে, এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব বা আমন্ত্রণ পাওয়া যায়নি। তবে এই প্রক্রিয়া উন্মুক্ত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি সময় নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে এবং তারপরেই জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে বাংলাদেশ তার অবস্থান জানাবে।
এর আগে গত ৩০ আগস্ট পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির মন্তব্য করেছিলেন যে, এই চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশ কোনো ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখছে না, বরং এটি নতুন সুযোগের দ্বার উন্মোচন করতে পারে। অন্যদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান পূর্বে সংসদে জানিয়েছিলেন যে, এ ধরনের কোনো প্রস্তাব পেলে সরকার তা অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।
আরও পড়ুন: মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ যুক্ত হবে কি না, সিদ্ধান্ত নেবে সরকার: আইনমন্ত্রী
মক্কা চুক্তির পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার চলমান দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত নিরাপত্তা কাঠামোর প্রেক্ষাপটে এই জোট গঠিত হয়েছে। মার্কিন নিরাপত্তাছাতার বাইরে এসে মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যপন্থী শক্তিগুলোর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে একে দেখা হচ্ছে। তুরস্কের উচ্চপ্রযুক্তির সমরাস্ত্র ও ড্রোন শিল্প, পাকিস্তানের পরমাণু ও গতানুগতিক সামরিক সক্ষমতা এবং সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তির সমন্বয়ে গঠিত এই জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সংযুক্তি দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, সামরিক সরঞ্জামের সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা এবং যৌথ প্রশিক্ষণের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে বলে মনে করেন অনেক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ।
তবে এই জোটে বাংলাদেশের যোগদানকে কেন্দ্র করে ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ও কিছু ঝুঁকির কথাও উঠে আসছে। বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তির অন্যতম প্রধান অংশীদার যেহেতু পাকিস্তান, তাই ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর শক্তির ভারসাম্যের বিষয়টি সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে। বিশেষ করে, এই জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য আগ্রহ বা অংশগ্রহণকে ভারত কীভাবে দেখবে এবং এর ফলে আঞ্চলিক কূটনীতিতে কোনো কূটনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে কি না, তা নিয়েও চলছে নানা পর্যায়ের বিশ্লেষণ। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই ঘটনার ওপর নিবিড়ভাবে নজর রাখছে এবং তাদের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব খতিয়ে দেখছে বলে এর আগে জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিকদের একাংশ মনে করছেন যে, কোনো ধরনের হুজুগে বা আবেগের বশবর্তী হয়ে তড়িঘড়ি করে এমন কোনো কৌশলগত চুক্তিতে জড়ানো ঠিক হবে না। যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর পূর্ণাঙ্গ ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ (Cost-Benefit Analysis) করা জরুরি। দেশের জাতীয় স্বার্থ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে, সংসদীয় আলোচনা এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময় সাপেক্ষে একটি জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








