গুম-নির্যাতনে ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ তৈরি করেছিল শেখ হাসিনার সরকার: স্পিকার
ছবি: সংগৃহীত
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের স্বৈরাচারী ও মাফিয়া শাসনামলে দেশে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন এবং ভিন্নমত দমনের মাধ্যমে এক ভীতিকর রাষ্ট্রীয় পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
তিনি স্পষ্ট করে জানান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মীরা কখনো এ ধরনের নজিরবিহীন নিপীড়ন ও বিভীষিকাময় সংস্কৃতির শিকার হননি।
মঙ্গলবার (০১ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিকভাবে নিপীড়নের শিকার বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্যদের সঙ্গে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) মহাসচিব অ্যান্ডা ফিলিপের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতির বক্তব্যে স্পিকার এই মন্তব্য করেন। বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এবং চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো যখন বিগত শাসনব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক দমন-পীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র উন্মোচন করে নিপীড়ন থেকে বিপ্লব: রাষ্ট্রের পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘন উন্মোচন শীর্ষক একটি বিশেষ ডকুমেন্টেশন উপস্থাপন করা হয়। সভায় উপস্থিত আইপিইউ মহাসচিব অ্যান্ডা ফিলিপ বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক নিপীড়নকে অত্যন্ত অমানবিক ও জঘন্য হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করেন যে, তার নিজের জন্মভূমি রোমানিয়ায় কমিউনিস্ট শাসক নিকোলাই চউশেস্কুর নির্মম দমননীতির সঙ্গে বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারপ্রধানের শাসনপদ্ধতির এক অদ্ভুত ও স্পষ্ট মিল রয়েছে। সফর শেষে তিনি বাংলাদেশের এই মানবাধিকার পরিস্থিতি ও গুম-হত্যার সার্বিক বিষয় নিয়ে আইপিইউর গভর্নিং বডির নিকট একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত প্রতিবেদন পেশ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে অংশ নেওয়া বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের ভয়াবহ গুম, কারাবাস ও নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা তুলে ধরেন। বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শকে চিরতরে নির্মূল করতে এবং নিজেদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতেই রাষ্ট্রযন্ত্রকে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, তার জ্বলন্ত প্রমাণ দেন তারা।
বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী এবং সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনা অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল তাঁর স্বামী এম ইলিয়াস আলীকে গুম করার মাধ্যমেই মূলত বাংলাদেশের মানুষের কাছে গুম শব্দটি নতুন ও আতঙ্কজনকভাবে পরিচিতি লাভ করে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তাদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার হীন উদ্দেশ্যেই সুপরিকল্পিতভাবে ইলিয়াস আলীকে গুম করেছিল। তিনি এই বিচারবহির্ভূত গুম ও হত্যাযজ্ঞের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিচার নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
আরও পড়ুন: জাতিসংঘের আগে দিল্লি নয়, বোয়িং কেনায় চাপ নেই
সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তার বক্তব্যে ভাই সাজেদুল ইসলাম সুমনের দীর্ঘদিনের নিখোঁজ ও গুম থাকার মর্মস্পর্শী বিবরণ তুলে ধরেন। কীভাবে একটি পরিবার দশকের পর দশক ধরে বিচারহীনতা ও স্বজন হারানোর বেদনায় দিন কাটিয়েছে, তা শুনে উপস্থিত সবাই আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়েন।
ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান এবং হুমাম কাদের চৌধুরী তাদের ওপর চলা ভয়াবহ মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের রোমহর্ষক বর্ণনা দেন। ব্যারিস্টার আরমান কুখ্যাত গোপন বন্দিশালা আয়নাঘর-এ কাটানো তার নির্মম বন্দিজীবনের হাড়হিম করা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
অন্যদিকে, সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী জানান, তাকে একটানা প্রায় ৭ মাস সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার গোপন বন্দিশালায় চরম অমানবিক, অন্ধকার ও পৈশাচিক উপায়ে আটকে রেখে পদ্ধতিগত নির্যাতন চালানো হয়েছিল।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তার বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন যে, বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠ চিরতরে রোধ করতে তৎকালীন সরকার বহুমুখী দমননীতি গ্রহণ করেছিল। এর মধ্যে অন্যতম হাতিয়ার ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে বলপূর্বক গুম করানো, ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা চালানো এবং কুখ্যাত আয়নাঘর-এর মতো গোপন বন্দিশালা তৈরি করা। পাশাপাশি, স্বাধীন মতামত ও গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো কালো আইনগুলোর চরম ও নির্বিচার অপপ্রয়োগ করা হয়েছিল।
বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নওশাদ জমির, জহরত আদিব চৌধুরী, মোছা. তাহসিনা রুশদীর, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান, আনিসুর রহমান, মাধবী মারমাসহ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ। তারা প্রত্যেকেই তৎকালীন মাফিয়াতন্ত্রের আমলে নিজ নিজ এলাকার রাজনৈতিক নিপীড়ন ও ভয়ভীতির তিক্ত অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইপিইউ মহাসচিবের এই বাংলাদেশ সফর এবং ভুক্তভোগী সংসদ সদস্যদের সরাসরি সাক্ষ্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্রকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরবে এবং দীর্ঘস্থায়ী বিচার প্রক্রিয়ার পথকে ত্বরান্বিত করবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








