দুদকের প্রতিবেদন ও সংবাদ প্রত্যাখ্যান আসিফ মাহমুদের
ছবি: সংগৃহীত
নিজের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানসংক্রান্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
তার দাবি, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে দুদকের প্রকৃত প্রতিবেদনের মিল নেই। এ বিষয়ে দুদকের মুখপাত্রের বক্তব্য প্রত্যাহার এবং সংশ্লিষ্ট সংবাদ সরিয়ে নেওয়ার জন্য ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। তবে দুদকের অনুসন্ধান এখনো চলমান এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণের জন্য তদন্ত ও পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হওয়া প্রয়োজন।
বুধবার (০২ সেপ্টেম্বর) রাতে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে আসিফ মাহমুদ এসব কথা বলেন।
এর আগে একই দিন দুদক জানায়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে তার দায়িত্ব পালনকালের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে চার সদস্যের একটি দল গঠন করা হয়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি এবং কেনাকাটাসংক্রান্ত অনিয়ম। দুদকের জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও বদলিকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। একটি প্রতিবেদনে ১৮৮ জন কর্মকর্তার বদলি ও পদোন্নতিতে প্রায় ৪ কোটি টাকার বেশি আর্থিক লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, আসিফ মাহমুদের ব্যাখ্যায় ১৮২ জন কর্মকর্তার পদোন্নতির প্রসঙ্গ এসেছে। এ দুটি সংখ্যা ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট নিয়ে তার বক্তব্য এবং দুদকের অভিযোগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
ব্রিফিংয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, মিডিয়ার রিপোর্টের সঙ্গে দুদকের রিপোর্টের মিল নেই।
তিনি দাবি করেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে দুদকের বক্তব্য ও প্রকৃত প্রতিবেদনের তথ্য যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি।
তার ভাষ্য, দুদকের মুখপাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বক্তব্য প্রত্যাহার না করলে এবং ওই বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত সংবাদগুলো প্রত্যাহার না করা হলে তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেবেন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সরিয়ে না নিলে মানহানির মামলা করার কথাও জানান তিনি।
তার বিরুদ্ধে ৩৮ জন কর্মকর্তাকে চলতি দায়িত্ব থেকে পূর্ণ মেয়াদে পদায়নের অভিযোগ প্রসঙ্গে আসিফ মাহমুদ বলেন, আদালতের রায়ের কারণেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চলতি দায়িত্ব বাতিল করে তাদের মূল পদে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগ কীভাবে যুক্ত করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তার ভাষায়, দুদক কি আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ করছে? এনটিভির প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যের বিস্তারিত অংশে বলা হয়েছে, ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিলের পর তাঁদের স্বপদে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি আদালতের রায় বাস্তবায়নের অংশ ছিল।
১৮২ জন কর্মকর্তার পদোন্নতি নিয়েও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন এনসিপির এই মুখপাত্র।
তিনি বলেন, পদোন্নতির প্রক্রিয়াটি সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) নিয়ম অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে।
আরও পড়ুন: আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে: দুদক
তার দাবি, বিভিন্ন সময়ে শূন্য হওয়া সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদে পদোন্নতির জন্য যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রস্তুত করে পিএসসির মতামত চাওয়া হয়েছিল।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগে ১৫০টি পদের কথা উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে ১৮২টি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল।
আসিফ মাহমুদের ভাষ্য, তার বিরুদ্ধে যে দুটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভিযোগ ও প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে, সেগুলো ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ঘটেছে। কিন্তু গণমাধ্যমে সেগুলোকে অন্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, দুটি ঘটনাই সচিব পর্যায়ে সম্পন্ন হয়েছে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে ফাঁসানো হচ্ছে। তার অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলের দিনের আলোতে করা দুর্নীতি আড়াল করতেই তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে এসব বক্তব্য তার নিজস্ব দাবি; দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগগুলোর প্রকৃত ভিত্তি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
দুদকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আসিফ মাহমুদ।
তিনি বলেন, তদন্তকারী সংস্থাকে অভিযোগ যাচাই এবং বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
তার মতে, কোনো অভিযোগের বিষয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট নথি ও তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, দুদককে বিরোধী মত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
দুদকের সংস্কার প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন তিনি। এ সময় বিএনপির ভূমিকার সমালোচনা করে আসিফ মাহমুদ দাবি করেন, এ কারণেই দলটি দুদকের সংস্কার প্রক্রিয়া সমর্থন করেনি। সরকারের প্রতিও বিরোধী মত দমনের রাজনীতি থেকে সরে আসার আহ্বান জানান তিনি। তার বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে দুদকের অনুসন্ধান ও রাজনৈতিক বিতর্ক দুই বিষয়ই আলোচনায় এসেছে।
দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে। অভিযোগের মধ্যে বদলি-বাণিজ্য, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম এবং অবৈধ আয়ের বিষয় রয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনুসন্ধানের প্রাথমিক তথ্য হিসেবে অর্থ লেনদেনের কথা প্রকাশিত হলেও, সেগুলো এখনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতে প্রমাণিত অভিযোগ নয়।
এদিকে, আসিফ মাহমুদ বলেছেন, সত্য উদঘাটনের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে তিনি প্রস্তুত। একই সঙ্গে তিনি তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত সংবাদ প্রত্যাহার এবং দুদকের বক্তব্য স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন। এখন দুদকের অনুসন্ধানের অগ্রগতি, সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই এবং অভিযোগের বিষয়ে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপের ওপরই নির্ভর করবে বিষয়টির পরিণতি।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








