শিশু বলাৎকারের অভিযোগে মোহাম্মদপুরে মাদরাসা শিক্ষক গ্রেফতার
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ১৩ বছর বয়সী এক স্কুলশিক্ষার্থীকে কোরআন শেখানোর আড়ালে একাধিকবার বলাৎকারের অভিযোগে মো. হুসাইন আহমেদ (৪৮) নামে এক শিক্ষককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রবিবার (০৬ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৫টার দিকে নূরজাহান রোডের এস/২২এ বায়তুল ফজল জামে মসজিদ ও সংলগ্ন মাদরাসা থেকে তাকে আটক করা হয়। পরে ভুক্তভোগী শিশুর বাবা বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন।
সোমবার (০৭ সেপ্টেম্বর) গ্রেফতার শিক্ষককে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশ ও ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, শিশুটি অন্য একটি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি কোরআন শেখানোর জন্য তাকে নূরজাহান রোডের বায়তুল ফজল জামে মসজিদে পাঠাতেন তার বাবা। সেখানে প্রতিদিন বিকেলে অন্যান্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে মো. হুসাইন আহমেদের কাছে কোরআন পড়ত সে।
অভিযোগ রয়েছে, কোরআন পড়ানোর সময় বিভিন্ন অজুহাতে শিক্ষক ওই শিশুকে অন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আলাদা করে নিজের কক্ষ বা শয়নকক্ষে নিয়ে যেতেন এবং সেখানে একাধিকবার যৌন নিপীড়ন করেন।
পরিবারের অভিযোগে বলা হয়েছে, সর্বশেষ গত ২ সেপ্টেম্বরও শিশুটিকে একইভাবে নির্যাতন করা হয়।
ভুক্তভোগীর পরিবার জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে শিশুটি কোরআন শেখার জন্য ওই মসজিদে যেতে অনীহা প্রকাশ করছিল। পরিবারের সদস্যরা কারণ জানতে চাইলে একপর্যায়ে সে শিক্ষকের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগের কথা জানায়।
জানা গেছে, শিশুটি প্রথমে এক আত্মীয়ের কাছে বিষয়টি প্রকাশ করে এবং জানায়, ঘটনার কারণে সে ওই স্থানে আবার যেতে ভয় পাচ্ছে। পরে বিষয়টি পরিবারের অন্য সদস্যদের মাধ্যমে শিশুটির বাবা জানতে পারেন।
ভুক্তভোগীর বাবার লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অভিযুক্ত হুসাইন আহমেদ প্রায় তিন বছর ধরে ওই মসজিদে কোরআন শিক্ষা দিয়ে আসছেন এবং শিশুটি প্রায় দুই বছর ধরে তার কাছে পড়াশোনা করছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২ সেপ্টেম্বর অন্য শিক্ষার্থীদের কোরআন পড়ানো শেষ হওয়ার পর শিক্ষক শিশুটিকে একা রেখে একটি কক্ষে নিয়ে যান এবং সেখানে তার ওপর যৌন নির্যাতন চালান। এর আগে আরও কয়েকবার একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: মোহাম্মদপুরে ৮ মামলার আসামি লাদেন গ্রুপের সদস্য রিপন গ্রেফতার
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, শিশুটিকে ঘটনার কথা কাউকে না বলতে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছিল।
শিশুটির বাবা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অভিযুক্ত শিক্ষক তার ছেলেকে বিভিন্নভাবে ভয় দেখাতেন এবং ঘটনা প্রকাশ করলে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি তার বাবার ক্ষতি হওয়ার ভয়ও দেখিয়েছেন বলে শিশুটি জানিয়েছে। তবে এসব বক্তব্য বর্তমানে ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে; অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর রোববার বিকেলে শিশুটির বাবা ও পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে বায়তুল ফজল মাদ্রাসায় যান। সেখানে অভিযুক্ত শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছিলেন বলে শিশুটির বাবা দাবি করেছেন। একপর্যায়ে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং কয়েকজন অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধর করেন। খবর পেয়ে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং হুসাইন আহমেদকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে থানায় যায়।
মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল হালিম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ ওই শিক্ষককে আটক করে। পরে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। সোমবার তাকে আদালতে পাঠানোর তথ্যও নিশ্চিত করেছে পুলিশ। অভিযোগের পর শিশুটির স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়েও প্রক্রিয়া নেওয়া হচ্ছে।
শিশুটির বাবা আরও জানিয়েছেন, ৭ সেপ্টেম্বর তার ছেলের মেডিকেল পরীক্ষা করানোর কথা রয়েছে। তবে পরীক্ষার ফলাফল বা এ বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
এদিকে, ভুক্তভোগী শিশুর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। শিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ না করার আইনগত ও মানবিক নীতি অনুসরণ করে তার নাম, ছবি বা এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, যার মাধ্যমে তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, মামলার তদন্তের ভিত্তিতে অভিযোগের বিস্তারিত যাচাই করা হবে এবং তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গ্রেফতার হওয়া শিক্ষক এখনো অভিযোগের বিষয়ে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হননি; তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়ার বিষয়।
ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিলেও আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগের নিষ্পত্তি করার ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছে পুলিশ। একই সঙ্গে শিশুদের ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সতর্কতা, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের একান্তে থাকার পরিস্থিতি এড়ানোর বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








