নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১১:৩৭, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাভারে অটোরিকশাচালককে রক্ষা করতে গিয়ে এসবি কর্মকর্তা খুন

সাভারে অটোরিকশাচালককে রক্ষা করতে গিয়ে এসবি কর্মকর্তা খুন

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার সাভারের আমিনবাজার এলাকায় একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এক উপপরিদর্শককে (এসআই) পিটিয়ে হত্যার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। বৃদ্ধ এক অটোরিকশাচালককে মারধরের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ও গাড়ি পার্কিংয়ের জেরে এই নৃশংস হামলার শিকার হন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। এ সময় হামলাকারীদের বাধা দিতে গেলে তার ছোট ছেলেও গুরুতর আহত হন এবং হামলাকারীরা তাদের মালিকানাধীন একটি কারখানায় ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তবে হামলার প্রকৃত কারণ ও ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

নিহত পুলিশ সদস্যের নাম মো. আলতাফ হোসেন (৫৮)। তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) স্পেশাল ব্র্যাঞ্চের ঢাকার মালিবাগ জোনে উপপরিদর্শক (এসআই) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার ছোট ছেলে মো. আরিফুল ইসলাম (২৬) গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। 

আলতাফ হোসেন সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার সাধুপাড়া গ্রামের প্রয়াত জুরাইন আলী শেখের ছেলে। তিনি পরিবার নিয়ে সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশি মদিনা সিটি এলাকায় ভাড়া থাকতেন। পাশাপাশি ওই এলাকায় নিজের পাঁচ শতাংশ জমিতে টিনশেডের একটি কারখানায় মিনি গার্মেন্টস পরিচালনা করতেন।

পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাতে আমিনবাজারের বড়দেশি এলাকায় আলতাফ হোসেন ও তার ছেলের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ঘটনার সময় রাত ৮টা থেকে রাত ১১টার মধ্যে বলা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পুলিশ ঘটনাটিকে গাড়ি পার্কিং ও কথা-কাটাকাটিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হিসেবে উল্লেখ করলেও পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় একজন বৃদ্ধ অটোরিকশাচালককে মারধরের প্রতিবাদ করার বিষয়টি উঠে এসেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কারখানার কাছেই বাসায় ফেরার পথে আলতাফ হোসেন কয়েকজন যুবককে এক বৃদ্ধ অটোরিকশাচালককে মারধর করতে দেখেন। তিনি এর প্রতিবাদ করলে যুবকেরা তার ওপরও চড়াও হন। পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে তিনি নিজেকে পুলিশ সদস্য পরিচয় দিয়ে দৌড়ে নিজের কারখানার ভেতরে চলে যান। পরে হামলাকারীরা আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে ডেকে এনে কারখানায় হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে বলা হয়েছে, কারখানার সামনে একটি প্রাইভেটকার রাখা নিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে আলতাফ হোসেন ও তার ছেলের বিরোধ হয়। 

ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন জানিয়েছেন, গাড়ি পার্কিং নিয়ে দুই পক্ষের ঝামেলা মেটাতে গিয়েই ওই এসআই ও তাঁর ছেলে হামলার শিকার হন। পুলিশের এই বক্তব্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার পার্থক্য রয়েছে।

আরও পড়ুন: মোহাম্মদপুরে ৮ মামলার আসামি লাদেন গ্রুপের সদস্য রিপন গ্রেফতার

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, পরে হামলাকারীরা কারখানায় ঢুকে মেশিন ও গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে আলতাফ হোসেন ও তার ছেলে আরিফুল ইসলামকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে তারা চলে যায়। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক আলতাফ হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন। তার ছেলে আরিফুল ইসলাম গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল আলম জানিয়েছেন, নিহত আলতাফ হোসেন ডিএমপির এসবিতে কর্মরত ছিলেন। তিনি পরিবার নিয়ে বড়দেশি এলাকায় ভাড়া থাকতেন এবং সেখানে নিজের জমিতে মিনি গার্মেন্টস পরিচালনা করতেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও আটকের চেষ্টা চলছে।

ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। 

পুলিশ জানিয়েছে, হামলার কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং ঘটনার ধারাবাহিকতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে গাড়ি পার্কিং নিয়ে বিরোধের কথা বলা হলেও, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় অটোরিকশাচালককে মারধরের প্রতিবাদ করার বিষয়টি তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

এ ঘটনার বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও সময় ও ঘটনার কারণ নিয়ে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। সাভার মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল আলম প্রথমে ঘটনাস্থলে থাকার কথা জানিয়ে পরে বিস্তারিত জানানোর কথা বলেছিলেন। পরবর্তী বক্তব্যে তিনি আলতাফ হোসেনের পরিচয় ও হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে হামলার সুনির্দিষ্ট কারণ জানাতে পারেনি পুলিশ।

ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে আমিনবাজার এলাকার অপরাধ পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। অতীতে এ এলাকায় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০০৭ সালের ৩ মার্চ আমিনবাজারের সালেহপুর এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে র‍্যাব-১১-এর ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর (ডিএডি) হুমায়ুন কবির ও কনস্টেবল ফুল মিয়া নিহত হন। এছাড়া আমিনবাজারে মতিউর রহমান নামে পুলিশের আরেক উপপরিদর্শকও সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হয়েছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

তবে অতীতের এসব ঘটনা এবং বর্তমান হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কোনো সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বর্তমান ঘটনার তদন্তে হামলাকারীদের শনাক্ত, হামলার কারণ নির্ধারণ এবং আলতাফ হোসেনের মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি উদ্‌ঘাটনই এখন প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়