নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৮:৫৫, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেয়ের বিয়ের আগেই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নির্মম খুন বাবা

মেয়ের বিয়ের আগেই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নির্মম খুন বাবা

ছবি: সংগৃহীত

মেয়ের বিয়ের দিন-তারিখ চূড়ান্ত করার আনন্দঘন আয়োজন মুহূর্তেই রূপ নিয়েছে এক গভীর শোকে। ছোট মেয়ের বিয়ের খরচ জোগাতে গ্রামের ১১ শতাংশ জমি বিক্রির টাকা ও মুঠোফোন সঙ্গে নিয়ে জামালপুর থেকে গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন ৫০ বছর বয়সী ইসমাইল হোসেন। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই নিথর দেহে তাকে ফিরতে হলো মর্গে। 

শুক্রবার (০৪ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর মহাখালী-বনানী এলাকার ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর থেকে মুখে স্কচটেপ বা টেপ মোড়ানো এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের ইউনিফর্মের মতো নীল রঙের শার্ট ও লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করে বনানী থানা পুলিশ। প্রাথমিক তদন্ত ও পরিবারের সদস্যদের বরা୍তে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে জমি বিক্রির টাকা ছিনতাই ও ঠাণ্ডা মাথায় হত্যার ধারণা করা হচ্ছে।

পুলিশ ও স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, নিহত ইসমাইল হোসেন জামালপুর সদর উপজেলার হবদেশ গ্রামের জালাল উদ্দিনের ছেলে। তিনি আগে গাজীপুরের ডেল্টা স্পিনিং মিলে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে সুনামের সঙ্গে চাকরি করতেন। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে প্রায় ৯ মাস আগে তিনি সেই চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর থেকে পরিবার নিয়ে কাশিমপুরে বসবাস করলেও প্রায় চার মাস আগে তিনি স্থায়ীভাবে জামালপুরের গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান এবং সেখানে তার বৃদ্ধ মা ও বড় বোনের সঙ্গে বসবাস করছিলেন। অন্যদিকে তার স্ত্রী, দুই সন্তান এবং ছেলের বউ জীবিকা ও অন্যান্য প্রয়োজনে গাজীপুরেই অবস্থান করছিলেন।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ইসমাইলের ছোট মেয়ে শারমিনের বিয়ের কথাবার্তা ও দিন-তারিখ চূড়ান্ত করার মাধ্যমেই পরিবারে একটি খুশির উপলক্ষ আসার কথা ছিল। এই বিয়ের খরচ ও ঋণের বোঝা মেটানোর উদ্দেশ্যে তিনি সম্প্রতি গ্রামের বাড়ির ১১ শতাংশ জমি সাড়ে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করেন। জমি বিক্রির ওই টাকা থেকে পূর্বের প্রায় আড়াই লাখ টাকার ঋণ পরিশোধ করেন এবং কিছু অংশ দিয়ে গ্রামের বাড়িতে একটি ঘর নির্মাণ করেন। সমস্ত হিসাব ও প্রয়োজনীয় কাজ শেষে অবশিষ্ট নগদ প্রায় ৫ লাখ টাকা, একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন, একটি বাটন ফোন এবং কিছু বাজার নিয়ে গত বৃহস্পতিবার (০৩ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে জামালপুর থেকে ঢাকার বাসে রওনা হন তিনি।

আরও পড়ুন: এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে স্কচটেপে মোড়ানো মরদেহ উদ্ধার

যাত্রার প্রাক্কালে বৃহস্পতিবার রাত এগারোটার দিকে ইসমাইল তার ছেলে হাসানকে ফোন করে জানান যে, তিনি রাতেই রওনা হচ্ছেন এবং শুক্রবার সকালে গাজীপুর এসে পৌঁছাবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুক্রবার সকালে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে ও বাস থেকে আনতে ছেলে রাসেল ও হাসান গাজীপুরের জিরানী বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও তার কোনো সাড়া মেলেনি। পরবর্তীতে তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে বারবার কল করা হলেও সেটি সম্পূর্ণ বন্ধ পাওয়া যায়। সারাদিন উৎকণ্ঠার পর বনানী থানা পুলিশ প্রযুক্তির সহায়তায় আঙুলের ছাপ নিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে তার পরিচয় নিশ্চিত করে এবং জামালপুর পুলিশ ফাঁড়ির মাধ্যমে পরিবারকে মর্মান্তিক এই সংবাদটি জানায়।

শুক্রবার সকাল পৌনে নয়টার দিকে বনানী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নজরুল ইসলাম তালুকদার অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর থেকে মরদেহটি উদ্ধার করেন। পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে নিহতের ছেলে মো. হাসান ও অন্যান্য স্বজনেরা এসে মরদেহটি তাদের বাবা ইসমাইল হোসেন হিসেবে শনাক্ত করেন। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এ মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে যে, ইসমাইল হোসেনকে অন্য কোথাও বা চলন্ত গাড়িতে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। পরবর্তীতে হত্যাকাণ্ডের তথ্য ও পরিচয় গোপন করার উদ্দেশ্যে কোনো একটি সন্দেহভাজন গাড়িতে করে এনে মরদেহটি ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ফেলে পালিয়ে যায় অপরাধীরা। পুরো এক্সপ্রেসওয়ের নিরাপত্তা ও ক্লোজ সার্কিট (সিসিটিভি) ক্যামেরার ফুটেজ নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সন্দেহভাজন কয়েকটি গাড়িও শনাক্ত করা হয়েছে। দ্রুত ওই গাড়িগুলো আটক করতে পারলে এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য এবং এর সঙ্গে জড়িত চক্রটিকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

নিহতের ছেলে মো. হাসান ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা ক্ষোভ ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ইসমাইলের কাছে থাকা নগদ ৫ লাখ টাকা, দুটি মোবাইল ফোন ও সঙ্গে থাকা বাজারের ব্যাগটির কোনো হদিস মিলছে না। তাদের জোরালো ধারণা, জামানত বা জমি বিক্রির নগদ টাকার খবর বা উপস্থিতি টের পেয়ে দুর্বৃত্ত বা কোনো সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র বাসের যাত্রাপথে কিংবা অন্য কোনো প্রলোভনে তাকে টার্গেট করে। পরে সর্বস্ব লুটে নিয়ে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। একমাত্র মেয়ের বিয়ের ঠিক প্রাক্কালে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডে পুরো পরিবার ও এলাকাবাড়িতে শোকের মাতম চলছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়