ডেঙ্গুতে আরও ২ মৃত্যু, হাসপাতালে ৯৮৮
ফাইল ছবি
দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এডিস মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ৯৮৮ জন। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৩ জনে। আর বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪১ হাজার ৩২ জনে পৌঁছেছে।
শনিবার (০৫ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের নিয়মিত ডেঙ্গুবিষয়ক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনের তুলনায় দৈনিক ভর্তি কিছুটা কমলেও চলতি বছরের মোট রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়েই রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া দুজনই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার বাসিন্দা। তাদের মধ্যে একজন পুরুষ ও একজন নারী। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৯৮৮ রোগীর মধ্যে ৬১১ জন পুরুষ এবং ৩৭৭ জন নারী। অর্থাৎ এক দিনের নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা নারীর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এদিনের ভর্তি রোগীদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার হাসপাতালগুলোতে ১০২ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ১৪৯ জন ভর্তি হয়েছেন। ঢাকার দুই সিটি মিলিয়ে রাজধানীর দুই অংশেই নতুন রোগীর সংখ্যা ২৫১ জন, যা মোট দৈনিক ভর্তির প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ঢাকা বিভাগেও ডেঙ্গুর চাপ কমেনি। গত ২৪ ঘণ্টায় এ অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে ১৭৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর বাইরে বরিশাল বিভাগে ১৭১ জন, খুলনা বিভাগে ১৬৩ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১২৩ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৫০ জন, রাজশাহী বিভাগে ৪৯ জন এবং রংপুর বিভাগে ছয়জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবেও রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বিভাগে ডেঙ্গুর বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে বরিশাল, খুলনা ও ঢাকা বিভাগের বাইরে থাকা অঞ্চলগুলোতে রোগীর চাপ সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ধারাবাহিক তথ্যেও আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে দৈনিক হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়।
সর্বশেষ হিসাবের আগে ৪ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ৫১২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং ওই সময়ে কোনো মৃত্যুর খবর ছিল না। তখন চলতি বছরের মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার ৪৪ জন এবং মৃতের সংখ্যা ১১১। এক দিনের ব্যবধানে আরও ৯৮৮ জন ভর্তি এবং দুজনের মৃত্যু হওয়ায় মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪১ হাজার ৩২ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১১৩-তে উঠেছে। একই সময়ে ৭২৬ জন রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছিলেন।
সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মোট ৩৮ হাজার ১৭৯ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৮৫৩ জন।
আগস্টের শেষ দিক ও সেপ্টেম্বরের শুরুতে ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়েছে। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ১৬৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন, যা তখন পর্যন্ত চলতি বছরের সর্বোচ্চ দৈনিক ভর্তি ছিল। এর আগের দিন ৩০ আগস্ট দৈনিক ভর্তি হয়েছিল ১ হাজার ৯৭ জন। এরপর ১ সেপ্টেম্বর নতুন রোগী ভর্তির সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৩২৪-এ পৌঁছে, যা চলতি বছরের নতুন সর্বোচ্চ দৈনিক রেকর্ড তৈরি করে। ওই দিন পাঁচজনের মৃত্যু হয়। পরদিনও পাঁচজনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ১১০ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য আসে। ৩ সেপ্টেম্বরের ২৪ ঘণ্টায় আরও চারজনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ২৫২ জনের হাসপাতালে ভর্তির খবর পাওয়া যায়। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের শুরুতেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও হাসপাতালে রোগীর চাপ দ্রুত বেড়ে যায়।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে আরও ৪ জনের প্রাণহানি, হাসপাতালে ভর্তি ১১৫২
চলতি মাসের প্রথম তিন দিনেই দেশে ডেঙ্গুতে ১৪ জনের মৃত্যু এবং ৩ হাজার ৫৮৬ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ পরিসংখ্যানের মধ্য দিয়ে বর্ষা মৌসুমের শেষভাগে ডেঙ্গুর প্রকোপ কতটা দ্রুত বাড়ছে, তার একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মেডিকেল এনটোমোলজিস্ট কবিরুল বাশারের উদ্ধৃতি দিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাস মডেল অনুযায়ী সেপ্টেম্বরেই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে যদি বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকে।
রাজধানীর বাইরেও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামে চিকিৎসকেরা ডেঙ্গুর ক্রিটিক্যাল ফেজ নিয়ে সতর্ক করেছেন।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরে জেলায় ২ হাজার ২৪১ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ছয়জনের। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তখন ৭৮ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন; তাদের মধ্যে প্রায় ১০ থেকে ১৫ জনকে সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, জ্বর কমে যাওয়াকে সবসময় সুস্থতার লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না; জ্বর কমার পরের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা অনেক রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানও দেখাচ্ছে, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ প্রতিবছরই বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অধিদপ্তর ২০০০ সাল থেকে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য সংরক্ষণ করছে। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে ২০২৩ সাল ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ বছর। ওই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন এবং মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন দুটিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ বার্ষিক রেকর্ড। এরপর ২০২৪ সালে ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৫ সালে রোগীর সংখ্যা সামান্য বেড়ে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন হলেও মৃত্যুর সংখ্যা কমে ৪১৩-তে নেমে আসে।
চলতি বছরের পরিস্থিতি অবশ্য ২০২৫ সালের তুলনায় এখনো মোট রোগী ও মৃত্যুর হিসাবে কম থাকলেও বছরের শেষ চার মাস সামনে থাকায় উদ্বেগের জায়গা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে দৈনিক হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা এক হাজারের কাছাকাছি বা তার বেশি থাকার প্রবণতা এবং সেপ্টেম্বরের শুরুতে একাধিক দিন এক হাজারের বেশি রোগী ভর্তি হওয়ার ঘটনা সংক্রমণের তীব্রতা বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ৩১ আগস্টের ১ হাজার ১৬৩, ১ সেপ্টেম্বরের ১ হাজার ৩২৪ এবং ৩ সেপ্টেম্বরের ১ হাজার ২৫২ রোগী ভর্তি এই ধারাবাহিকতা থেকে বোঝা যায়, কেবল রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও ডেঙ্গু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
এদিকে ডেঙ্গুর চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতেও রোগীর চাপ বাড়ছে। ঢাকার বাইরে বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী ভর্তি হচ্ছেন। ২ সেপ্টেম্বরের ২৪ ঘণ্টাতেই ১ হাজার ১১০ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছিল; তাদের মধ্যে ঢাকার পাশাপাশি বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও অন্যান্য অঞ্চলের রোগী ছিলেন। এর আগে ১ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৩২৪ জন নতুন রোগীর মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ছাড়াও ঢাকা বিভাগের অন্যান্য এলাকায় ২৯৮ জন, খুলনায় ২৪৬ জন, চট্টগ্রামে ১৩৯ জন, রাজশাহীতে ১১৪ জন, বরিশালে ১২১ জন এবং ময়মনসিংহে ৮৭ জন ভর্তি হন। এসব তথ্য ডেঙ্গুর ভৌগোলিক বিস্তারের পাশাপাশি রাজধানীর বাইরের হাসপাতালগুলোর ওপর বাড়তে থাকা চাপও তুলে ধরে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট ৪১ হাজার ৩২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ১১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৮ হাজার ১৭৯ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। ফলে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৮৫৩ জন। একদিকে প্রতিদিন শত শত রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন, অন্যদিকে নতুন রোগী ভর্তির হার বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা আবারও বাড়ছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং আক্রান্ত এলাকায় নিয়মিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি জ্বরের রোগীদের দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপরই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








