নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১১:৪৯, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্বর্ণের দাম কমাল বাজুস, ভরিতে কমলো ৩,৮৪৭ টাকা

স্বর্ণের দাম কমাল বাজুস, ভরিতে কমলো ৩,৮৪৭ টাকা

ফাইল ছবি

দেশের বাজারে এক দিনের ব্যবধানে আবারও কমেছে স্বর্ণের দাম। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ হাজার ২১৬ টাকা কমিয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের এক ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৬ টাকা। 

রবিবার (০৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টা থেকে দেশের সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে এ দর কার্যকর হয়েছে। স্থানীয় বাজারে তেজাবি বা পিওর গোল্ডের দাম কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সার্বিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে বাজুস। সংগঠনটির স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিংয়ের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিটির চেয়ারম্যান ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন সই করা বিজ্ঞপ্তিতে নতুন দরের বিষয়টি জানানো হয়েছে।

নতুন মূল্যতালিকায় ২২ ক্যারেটের পাশাপাশি অন্যান্য মানের স্বর্ণ ও রুপার দামও সমন্বয় করা হয়েছে। বাজুসের হিসাবে, ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের প্রতি গ্রাম স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার ১৬০ টাকা। ১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রামকে এক ভরি হিসেবে হিসাব করলে এর মূল্য দাঁড়ায় ২ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৬ টাকা। ২১ ক্যারেটের প্রতি গ্রাম স্বর্ণের দাম ১৯ হাজার ২৫৫ টাকা, অর্থাৎ প্রতি ভরি ২ লাখ ২৪ হাজার ৫৯০ টাকা। ১৮ ক্যারেটের প্রতি গ্রাম ১৬ হাজার ৫৩৫ টাকা, যা প্রতি ভরিতে ১ লাখ ৯২ হাজার ৮৬৪ টাকা। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতি গ্রাম স্বর্ণের দাম ১৩ হাজার ৫০৫ টাকা, অর্থাৎ প্রতি ভরি ১ লাখ ৫৭ হাজার ৫২২ টাকা।

স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার দামও কমিয়েছে বাজুস। নতুন দর অনুযায়ী, ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের প্রতি গ্রাম রুপার দাম ৪৪০ টাকা, ২১ ক্যারেটের ৪২৫ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ৩৬৫ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপার দাম ২৭৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এক ভরি হিসেবে ২২ ক্যারেট রুপার দাম প্রায় ৫ হাজার ১৩২ টাকা, ২১ ক্যারেট ৪ হাজার ৯৫৭ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৪ হাজার ২৫৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপার দাম প্রায় ৩ হাজার ২০৮ টাকা। নতুন এই মূল্যও পরবর্তী সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

স্বর্ণের দামে সাম্প্রতিক এই ওঠানামা বেশ দ্রুত হচ্ছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে দেশের বাজারে একাধিকবার মূল্য সমন্বয় করেছে বাজুস। সর্বশেষ ৩ সেপ্টেম্বর টানা তিন দফা দরপতনের পর ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম এক লাফে ৫ হাজার ৪৮২ টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ওই দাম সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হয়। বাজুস তখন স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের দাম বাড়ার কথা জানিয়েছিল। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ৩ সেপ্টেম্বরের এই দর এবং বৃদ্ধির পরিমাণ নিশ্চিত করা হয়েছে।

এর আগে ২ সেপ্টেম্বর ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৩১ হাজার ৮৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তার আগে ৩১ আগস্ট একই মানের স্বর্ণের দাম আরও ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা কমানো হয়। ২৯ আগস্টও ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরিতে ৭ হাজার ১১৫ টাকা কমিয়েছিল বাজুস। অর্থাৎ আগস্টের শেষ সপ্তাহে ধারাবাহিকভাবে দাম কমার পর সেপ্টেম্বরের শুরুতেই বাজারে আবার বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি দেখা দেয়; এরপর মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই দাম আবার কমানো হলো।

আরও পড়ুন: বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দরপতন, দেশের বাজারে বৃদ্ধি

স্বর্ণের এই ঘন ঘন মূল্য পরিবর্তনের পেছনে স্থানীয় তেজাবি স্বর্ণের বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর আগে চলতি বছরের মার্চে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের দরপতনের প্রভাবে বাংলাদেশেও মাত্র ২৩ দিনের ব্যবধানে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম প্রায় ৩৬ হাজার টাকা কমেছিল। 

তখন বাজুসের মূল্য নির্ধারণ কমিটির চেয়ারম্যান ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন জানিয়েছিলেন, দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক, আমদানি ব্যয় ও স্থানীয় চাহিদাসহ একাধিক বিষয় বিবেচনায় আসে। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন স্থানীয় খুচরা বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিফলিত হয় না; আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে কিছুটা সময়ের ব্যবধান থাকে।

বিশ্ববাজারের গতিবিধির সঙ্গে বাংলাদেশের বাজারের এই সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ের মূল্য ওঠানামাতেও স্পষ্ট হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, যুদ্ধ পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতি, ডলারের শক্তি, সুদের হার এবং বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ সবকিছুই আন্তর্জাতিক স্বর্ণের দরে প্রভাব ফেলে। বিশ্ববাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে স্থানীয় বাজারেও তেজাবি স্বর্ণের দামের মাধ্যমে তার প্রভাব পড়ে এবং বাজুস সেই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দেশীয় দর সমন্বয় করে।

এদিকে চলতি বছর দেশে স্বর্ণের দাম ইতোমধ্যে বহুবার সমন্বয় হয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ সমন্বয় নিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত স্বর্ণের দাম ১১২ বার সমন্বয় করা হয়েছে; এর মধ্যে ৫৬ দফা দাম বাড়ানো এবং ৫৬ দফা কমানো হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছিল বাজুস—যার মধ্যে ৬৪ বার দাম বাড়ানো হয়েছিল এবং ২৯ বার কমানো হয়েছিল।

চলতি বছরের শুরুতে অবশ্য স্বর্ণের বাজারে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। ২৯ জানুয়ারি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি ভরিতে ১৬ হাজার ২১৩ টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ৮৬ হাজার ১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা দেশের ইতিহাসে স্বর্ণের সর্বোচ্চ দাম হিসেবে রেকর্ড তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ও স্থানীয় বাজারের তেজাবি স্বর্ণের দরের ওঠানামার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেই রেকর্ড উচ্চতা থেকে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম কয়েক দফা কমেছে এবং আবার বেড়েছে।

ক্রেতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাজুস ঘোষিত স্বর্ণের নির্ধারিত বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে অলংকারের নকশা অনুযায়ী মজুরি যোগ হবে। তবে নির্ধারিত বিক্রয়মূল্যের মধ্যেই ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত থাকায় জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের কাছ থেকে আলাদাভাবে ভ্যাট আদায় করতে পারবে না। ফলে দোকানে স্বর্ণালংকার কেনার সময় শুধু বাজুসের ঘোষিত প্রতি ভরির দামই চূড়ান্ত ক্রয়মূল্য নয়; অলংকারের নকশা ও তৈরির ধরন অনুযায়ী প্রযোজ্য মজুরি যুক্ত হবে।

অলংকার বিনিময়ের ক্ষেত্রেও বাজুসের নির্ধারিত নিয়ম বহাল থাকবে। পুরোনো অলংকার বদলে নতুন অলংকার নেওয়ার সময় মজুরি ও পাথরের মূল্য বাদ দেওয়ার পর ১২ শতাংশ এবং পুরোনো স্বর্ণ বিক্রির ক্ষেত্রে ১৮ শতাংশ বাদ দেওয়ার বিধান রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আলাদাভাবে ভ্যাট বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। 

বাজুসের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পরবর্তী মূল্য ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত সারাদেশের জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন নির্ধারিত দরেই স্বর্ণ ও রুপার অলংকার বিক্রি হবে।

সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বরের শুরুতে স্বর্ণের বাজারে দ্রুত মূল্য পরিবর্তনের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ২ সেপ্টেম্বরের দরপতনের পর ৩ সেপ্টেম্বর বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি এবং মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে ৬ সেপ্টেম্বর আবার ভরিতে ২ হাজার ২১৬ টাকা কমানোর ঘটনা স্থানীয় স্বর্ণবাজারের অস্থিরতাই তুলে ধরছে। আপাতত ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ ২ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৬ টাকা, ২১ ক্যারেট ২ লাখ ২৪ হাজার ৫৯০ টাকা, ১৮ ক্যারেট ১ লাখ ৯২ হাজার ৮৬৪ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ ১ লাখ ৫৭ হাজার ৫২২ টাকা দরে বিক্রি হবে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এই দরই দেশের জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কার্যকর থাকবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়