নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৭:৪৮, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আপডেট: ১৭:৫০, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাইফুর রহমানের অবদান ও মৃত্যু রহস্য উন্মোচনের দাবি রিজভীর

সাইফুর রহমানের অবদান ও মৃত্যু রহস্য উন্মোচনের দাবি রিজভীর

ছবি: সংগৃহীত

দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের অবদান অপরিসীম বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। 

তিনি বলেছেন, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বিএনপি সরকার সবসময়ই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এবং ইতিহাসে এ ক্ষেত্রে দলটি চ্যাম্পিয়ন হিসেবে স্বীকৃত।

একইসঙ্গে সাইফুর রহমানের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা ছিল, নাকি এর পেছনে জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো ষড়যন্ত্র ছিল তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। 

তার দাবি, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সাইফুর রহমান যে নীতি ও সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা দেশের কৃষি, গ্রামীণ অবকাঠামো, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে। সেই কারণে তাঁর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তা অনুসন্ধানের মাধ্যমে পরিষ্কার করা উচিত।

সোমবার (০৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে এম সাইফুর রহমানের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে রিজভী এসব কথা বলেন। সভার আয়োজন করে এম সাইফুর রহমান স্মৃতি পরিষদ। প্রয়াত অর্থমন্ত্রীর ছেলে এম নাসের রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছ, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, জাসাস সভাপতি হেলাল খানসহ বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

সাইফুর রহমানের মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, তাঁর মতো একজন অর্থনীতিবিদের মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। ২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। সেদিন মৌলভীবাজারের নিজ বাড়ি থেকে ঢাকায় যাওয়ার পথে দুর্ঘটনাটি ঘটে। 

রিজভীর ভাষ্য, সাইফুর রহমানের অর্থনৈতিক অবদান ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাঁর মৃত্যুর ঘটনা নিছক দুর্ঘটনা ছিল কি না, তা অনুসন্ধান করা দরকার। তবে তাঁর বক্তব্যে এ বিষয়ে কোনো নতুন প্রমাণ বা তদন্তের ফল তুলে ধরা হয়নি।

আলোচনায় সাইফুর রহমানের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রশংসা করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, তিনি ছিলেন দক্ষ ও সক্ষম অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপক। 

তার দাবি, অর্থমন্ত্রী হিসেবে সাইফুর রহমান অর্থপাচার বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিলেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছিলেন। 

রিজভী বলেন, সাইফুর রহমানের সময়ে ব্যাংক লুট, ব্যাপক অর্থপাচার কিংবা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সরকারের বাজেট ঘাটতি পূরণের মতো ঘটনা শোনা যায়নি। বিপরীতে, পরবর্তী ১৭ বছরে দেশের অর্থনীতি লুটপাটের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

রিজভী আরও বলেন, বিএনপির শাসনামল ছিল গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের সময়। 

তার ভাষায়, দারিদ্র্য দূরীকরণে বিএনপি সবসময়ই চ্যাম্পিয়ন ছিল। 

আরও পড়ুন: ঘৃণা ও অসভ্য কথাবার্তাকে বিরোধী দল প্রশ্রয় দিচ্ছে: রিজভী

তিনি দাবি করেন, সাইফুর রহমানের কৃষি অর্থনীতিভিত্তিক কর্মসূচি উত্তরাঞ্চলের মৌসুমি অভাব মোকাবিলায় ভূমিকা রেখেছিল। বিশেষ করে কার্তিক মাসের অভাব দূর করার ক্ষেত্রে তাঁর কৃষি নীতির অবদানের কথা উল্লেখ করেন রিজভী। কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য কমানোর উদ্যোগকে তিনি সাইফুর রহমানের অর্থনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেন।

গ্রামীণ অর্থনীতির প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, কৃষির অফ-সিজনে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি। 

তার মতে, গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে মানুষ ভ্যান, রিকশা, অটোরিকশাসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত হতে পারে। এতে কৃষিনির্ভর মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে এবং দারিদ্র্য বিমোচনে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তিনি বলেন, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ওপর নির্ভর করে একটি দেশ সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যেতে পারে সাইফুর রহমান সেই সম্ভাবনাকে নীতিগতভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

সাইফুর রহমানের অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রসঙ্গও আলোচনায় উঠে আসে। রিজভী বলেন, ভ্যাট চালুর সময় ব্যাপক সমালোচনা হলেও পরবর্তী সময়ে কেউ তা বাতিল করেনি; বরং দেশের অর্থনীতিতে ভ্যাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। 

তিনি আরও দাবি করেন, সাইফুর রহমানের সময়ে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সুশৃঙ্খল ছিল এবং তার নীতিগুলো দেশের অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সহায়তা করেছে।

শেয়ারবাজার প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, সাইফুর রহমান অর্থমন্ত্রী থাকাকালে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের লুটপাট হয়নি। এটিকে তিনি তাঁর বড় অবদান হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও মজবুত অবস্থানে নিতে সাইফুর রহমানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তবে এসব বক্তব্য রিজভীর রাজনৈতিক মূল্যায়ন; সভায় এ বিষয়ে কোনো স্বাধীন পরিসংখ্যান বা নতুন সরকারি প্রতিবেদন উপস্থাপনের তথ্য পাওয়া যায়নি।

সামাজিক সুরক্ষার ধারণা প্রবর্তনের কৃতিত্বও সাইফুর রহমানকে দেন রিজভী। 

তিনি বলেন, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য একটি সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর ধারণা সাইফুর রহমান সামনে এনেছিলেন। 

রিজভীর দাবি, তাঁর অর্থনৈতিক নীতি ও কৃষিভিত্তিক কর্মসূচি অনুসরণ করে বাংলাদেশকে আবার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, দারিদ্র্যমুক্ত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব।

সাইফুর রহমানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, তিনি দেশের অর্থনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সম্মানিত ছিলেন। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এ সময় রিজভী ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও অর্থনীতিবিদ মনমোহন সিংয়ের প্রসঙ্গ টেনে দাবি করেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উদারীকরণের নীতির ওপর ভিত্তি করে ভারতেও অনুরূপ নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল। তবে এই বক্তব্যের সমর্থনে সভায় কোনো নির্দিষ্ট নীতিপত্র বা উদ্ধৃতি উপস্থাপন করা হয়নি।

সভায় সাইফুর রহমানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রসঙ্গও উঠে আসে। 

রিজভী বলেন, দেশের অর্থনীতির ভিত্তি তৈরিতে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ এবং তাঁর পরে আর কেউ অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাঁকে ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীও সাইফুর রহমানকে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি তৈরির কারিগর হিসেবে উল্লেখ করেন। 

তার মতে, মুক্তবাজার অর্থনীতির মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে সাইফুর রহমান বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছিলেন।

সাইফুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এর আগেও বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। তাঁর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে মৌলভীবাজারের বাহারমর্দানে কবর জিয়ারত, পুষ্পস্তবক অর্পণ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছিল। তিনি ২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।

আলোচনা সভার শেষ পর্যায়ে রিজভী বলেন, সাইফুর রহমানের দেখানো অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ আবারও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে। 

তিনি আশা প্রকাশ করেন, সঠিক নীতি গ্রহণ করা হলে কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি ও দারিদ্র্য বিমোচনে দেশ নতুন করে অগ্রগতি অর্জন করবে। একই সঙ্গে সাইফুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে যে প্রশ্ন তিনি তুলেছেন, তা অনুসন্ধানের মাধ্যমে পরিষ্কার করার প্রয়োজনীয়তার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়