নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১১:৩২, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এসএসসির পুনঃনিরীক্ষণে ফেল থেকে পাস ৪৫৮৫

এসএসসির পুনঃনিরীক্ষণে ফেল থেকে পাস ৪৫৮৫

ফাইল ছবি

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল পুনঃনিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের পর বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে পুনঃনিরীক্ষণের ফলাফলে ফেল থেকে পাস করেছেন ৪ হাজার ৫৮৫ জন শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩ হাজার ৭৯ জন। এর বাইরে বিভিন্ন বিষয়ে নম্বর, গ্রেড ও ফল পরিবর্তন হয়েছে আরও শিক্ষার্থীর।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে এসএসসি পরীক্ষা-২০২৬-এর পুনঃনিরীক্ষণসহ মূল্যায়নের ফল প্রকাশ করা হয়। আবেদনকারীদের দেওয়া মুঠোফোন নম্বরেও এসএমএসের মাধ্যমে ফল জানানো হয়েছে। পাশাপাশি নির্ধারিত অনলাইন পোর্টালে রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করে ফল দেখা যাচ্ছে।

এবারের পুনঃনিরীক্ষণের ফলকে ঘিরে আগ্রহ ছিল অন্য বছরের তুলনায় বেশি। এর প্রধান কারণ ছিল মূল ফলাফলে পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া এবং বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া। গত ১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার মূল ফল প্রকাশের পর ১১ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন নেওয়া হয়। আবেদন শেষ হওয়ার ২৪ দিন পর এবং মূল ফল প্রকাশের ৩১ দিন পর বৃহস্পতিবার সংশোধিত ফল প্রকাশ করা হলো।

শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এবার পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেন ৪ লাখ ২ হাজার ৫১ জন পরীক্ষার্থী। তবে একজন পরীক্ষার্থী একাধিক বিষয়ের উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করতে পারায় মোট আবেদনসংখ্যা পরীক্ষার্থীর সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে লিখিত পরীক্ষার ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৫টি এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৭১টি উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন জমা পড়ে। সব মিলিয়ে পুনঃনিরীক্ষণের আওতায় আসে ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি উত্তরপত্র।

পুনঃনিরীক্ষণের আবেদনের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি চাপ ছিল ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে। এ বোর্ডের ৯৪ হাজার ২৩৬ জন পরীক্ষার্থী লিখিত পরীক্ষার ২ লাখ ৭৭ হাজার ৬৬৫টি এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার ৫৮ হাজার ১২টি উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করেন। অর্থাৎ শুধু ঢাকা বোর্ডেই ৩ লাখের বেশি উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের আওতায় আসে।

ঢাকার পরও দেশের প্রায় সব শিক্ষা বোর্ডেই ব্যাপকসংখ্যক আবেদন জমা পড়ে। কুমিল্লা বোর্ডে ৩৫ হাজারের বেশি, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে ৩৯ হাজারের বেশি, যশোরে ২৮ হাজারের বেশি, বরিশালে ১৭ হাজারের বেশি, সিলেটে ২০ হাজারের বেশি, দিনাজপুরে ৩৭ হাজারের বেশি এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে ২৭ হাজার ৬৭৬ জন পরীক্ষার্থী পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করেন। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে আবেদনকারীর সংখ্যা ছিল ৪০ হাজারের বেশি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ২০ হাজারের বেশি। এসব সংখ্যাই ইঙ্গিত দেয়, এবারের মূল ফল নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ কতটা বিস্তৃত ছিল।

তবে এবারের পুনঃনিরীক্ষণ শুধু আগের প্রচলিত অর্থে খাতা চ্যালেঞ্জ ছিল না প্রক্রিয়াতেও এসেছে পরিবর্তন। বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছিলেন, এবার আবেদন করা উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের পাশাপাশি পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে। আগের ব্যবস্থায় মূলত উত্তরপত্রে কোনো প্রশ্নের নম্বর দেওয়া বাদ পড়েছে কি না, মোট নম্বর যোগে ভুল হয়েছে কি না, নম্বর সঠিকভাবে ওএমআর শিটে তোলা হয়েছে কি না কিংবা ওএমআর শিটে সঠিকভাবে বৃত্ত ভরাট করা হয়েছে কি না এসব বিষয় যাচাই করা হতো।

আরও পড়ুন: এসএসসি পুনর্নিরীক্ষণের ফল বৃহস্পতিবার সকালে

এবার সেই প্রক্রিয়ায় উত্তরপত্র পুনরায় মূল্যায়নের বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় ফলাফলে পরিবর্তনের সুযোগ আরও বিস্তৃত হয়েছে। ফলে শুধু নম্বর যোগ বা তথ্য স্থানান্তরের ভুল সংশোধন নয়, উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে কি না, তা যাচাই করা হয়েছে। এর ফল হিসেবে হাজারো শিক্ষার্থীর ফলাফলে পরিবর্তন ঘটেছে এবং ৪ হাজার ৫৮৫ জন শিক্ষার্থী ফেল থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। একইভাবে ৩ হাজার ৭৯ জন শিক্ষার্থী নতুন করে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন।

মূল ফলাফলের প্রেক্ষাপটও এবারের পুনঃনিরীক্ষণের ব্যাপকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত এসএসসি ও সমমানের ফলাফলে ১১টি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে গড় পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ, যা দীর্ঘ সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। একই সঙ্গে মূল ফলে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও আগের বছরের তুলনায় কমে যায়।

চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৮ লাখ ২৯ হাজারের বেশি। এর মধ্যে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অনুত্তীর্ণ হওয়ায় মূল ফল প্রকাশের পর থেকেই পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন নিয়ে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ শিক্ষার্থী আবেদন করায় এটি এবারের ফল পুনঃনিরীক্ষণকে একটি বড় আকারের কার্যক্রমে পরিণত করে।

পুনঃনিরীক্ষণের আবেদনের সংখ্যা শুধু শিক্ষার্থীদের ফেল বা পাসের ফল নিয়ে অসন্তোষের চিত্রই তুলে ধরে না; ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের মধ্যেও নম্বর বাড়ানো বা জিপিএ উন্নত করার প্রত্যাশা ছিল। কারণ একজন শিক্ষার্থী একটি বা একাধিক বিষয়ের নম্বর কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না পেলে সামগ্রিক জিপিএ-তে তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে জিপিএ-৫ পাওয়ার সীমার কাছাকাছি থাকা শিক্ষার্থীদের অনেকেই পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করেছেন।

এবারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, পুরো আবেদন প্রক্রিয়াটি অনলাইনভিত্তিক করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে শিক্ষার্থীরা অনলাইনে আবেদন করেন এবং প্রতিটি পত্রের জন্য নির্ধারিত ফি পরিশোধ করেন। ২০২৬ সালের পুনঃনিরীক্ষণ-সংক্রান্ত বোর্ডের নির্দেশনায় অনলাইন পোর্টাল ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

ফল প্রকাশের পর এখন সংশোধিত ফল জানার জন্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে যেতে হচ্ছে। একই সঙ্গে আবেদন করার সময় দেওয়া মুঠোফোন নম্বরে এসএমএস পাঠানো হয়েছে। সরাসরি নির্ধারিত পোর্টালেও ফল দেখা যাচ্ছে। এর জন্য এসএসসি পুনঃনিরীক্ষণের সরকারি ফলাফল পোর্টাল-এ গিয়ে বোর্ড নির্বাচন করে রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে ফল দেখা যায়। পোর্টালটিতে এসএসসি ২০২৬-এর জন্য ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অপশন রাখা হয়েছে।

মূল ফল প্রকাশের পর পুনঃনিরীক্ষণের সুযোগ শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য মূলত মূল্যায়ন বা ফল প্রস্তুতের কোনো ভুল থাকলে তা সংশোধন করা। অতীতে বিভিন্ন বোর্ডের পুনঃনিরীক্ষণের ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নম্বর যোগ, উত্তরপত্রে কোনো প্রশ্নের নম্বর বাদ পড়া কিংবা ওএমআর-সংক্রান্ত ভুলের কারণে অনেক শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ২০২৪ সালে শুধু ঢাকা শিক্ষা বোর্ডেই পুনঃনিরীক্ষণের পর ১০৪ জন ফেল থেকে পাস এবং ৩৬২ জন নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন; আরও ৩ হাজার ৮৫ জনের গ্রেড বা ফল পরিবর্তন হয়েছিল।

২০২৬ সালের চিত্র অবশ্য আগের ধারার তুলনায় অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে মূল পরীক্ষার পাসের হার কমেছে, অন্যদিকে রেকর্ডসংখ্যক উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের আওতায় এসেছে। এর সঙ্গে এবার পুনর্মূল্যায়নের বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ফল পরিবর্তনের সম্ভাবনাও বেড়েছে। ফলে ৪ হাজার ৫৮৫ জনের ফেল থেকে পাস এবং ৩ হাজার ৭৯ জনের নতুন করে জিপিএ-৫ পাওয়ার তথ্য এবারের এসএসসি ফলাফলের সামগ্রিক চিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

এখন পুনঃনিরীক্ষণের ফলের পর শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংশোধিত ফল অনুযায়ী পরবর্তী শিক্ষাজীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়া। যাদের ফল পরিবর্তিত হয়েছে, তাদের সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের প্রকাশিত ফল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নথিতে সংশোধিত তথ্য নিশ্চিত করে নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ফেল থেকে পাস করা এবং জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পরবর্তী একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রমে সংশোধিত ফল যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার পুনঃনিরীক্ষণের ফল শুধু কিছু শিক্ষার্থীর নম্বর বা গ্রেড পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি এবারের মূল পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অসন্তোষ এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থার প্রতি তাদের প্রত্যাশারও প্রতিফলন। প্রায় ৪ লাখ শিক্ষার্থীর আবেদন, ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের আওতায় আসা এবং শেষ পর্যন্ত ৪ হাজার ৫৮৫ জনের ফেল থেকে পাস ও ৩ হাজার ৭৯ জনের নতুন করে জিপিএ-৫ পাওয়ার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, এবারের এসএসসি ফল পুনঃনিরীক্ষণ ছিল সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় ও আলোচিত শিক্ষা-সংক্রান্ত কার্যক্রম।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়