নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১০:৪১, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস: শীর্ষে যশোর

আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস: শীর্ষে যশোর

ফাইল ছবি

যশোরে আত্মহত্যার প্রবণতা এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়; বরং এটি ধীরে ধীরে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে জেলায় ১৪ হাজার ৫১৬ জন নারী-পুরুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। তাদের মধ্যে ৩৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ ওই সময়ে গড়ে প্রতিদিন প্রায় সাতজন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। 

পরিসংখ্যানটির আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো, আত্মহত্যাচেষ্টাকারীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই ছয় বছরে আত্মহত্যার চেষ্টা করা পুরুষের সংখ্যা ৫ হাজার ৯০, বিপরীতে নারী ৯ হাজার ৬৬ জন। মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে ৩৪৪ জনের মধ্যে পুরুষ ১১৭ এবং নারী ২২৭ জন। জুলাই ২০২৬-এ যশোরের একটি মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সভায় সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিনিধি ডা. মৌসুমী বিনতে মানিক এসব তথ্য তুলে ধরেন; পরবর্তী সময়েও একই পরিসংখ্যান একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

এই সংখ্যার পেছনে রয়েছে অসংখ্য পরিবারের না-বলা সংকট। ২৫ বছর বয়সী সাংবাদিক সাকিন হোসেনের ঘটনাটি তারই একটি করুণ উদাহরণ। যশোরের স্থানীয় দৈনিক সুবর্ণভূমি ও স্যাটেলাইট গ্রিন টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন তিনি। 

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক নানা সমস্যায় মানসিক চাপে ছিলেন এই তরুণ। ১৬ জুলাই রাতে নিজ বাড়িতে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি বিদায়ী বার্তাও পরে আলোচনায় আসে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে তার বৃদ্ধ মা-বাবা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, বাইরে থেকে কর্মচঞ্চল ও স্বাভাবিক মনে হওয়া একজন মানুষের ভেতরেও গভীর মানসিক সংকট তৈরি হতে পারে। যশোরের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সাকিনের ঘটনাটিও উঠে এসেছে।

একই সময়ে আরেকটি ঘটনায় মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে অভয়নগরের ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরী। এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে পারিবারিক বকুনির পর সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠে। হাসপাতালের মানসিক স্বাস্থ্য কর্নারে তাকে কাউন্সেলিংও করানো হয় এবং পরবর্তী সময়ে ফলোআপে রাখা হয়েছে। অভয়নগরের স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন ঘটনায় শুধু শারীরিক চিকিৎসা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা হচ্ছে না; রোগীর মানসিক অবস্থাও মূল্যায়ন করে কাউন্সেলিং ও পরবর্তী নজরদারির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে শ্বশুরবাড়ির অশান্তি ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের মতো সংকট থেকেও আত্মহত্যাচেষ্টার ঘটনা চিকিৎসকদের সামনে এসেছে। অর্থাৎ যশোরে আত্মহত্যার ঝুঁকি কেবল একটি নির্দিষ্ট বয়স বা শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; কিশোর-কিশোরী, তরুণ, গৃহবধূসহ বিভিন্ন বয়স ও সামাজিক অবস্থানের মানুষ এর ঝুঁকিতে রয়েছেন।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যানের সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ের চিত্র মিলিয়ে দেখলেও বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। ২০২৬ সালের বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস সামনে রেখে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রতি এক লাখ তরুণের মধ্যে প্রায় ১৮ জন আত্মহত্যায় মারা গেছেন। ২০২৫ সালে এই হার বেড়ে প্রায় ১৯ জনে দাঁড়িয়েছে এক বছরের ব্যবধানে বৃদ্ধির হার প্রায় ৪ শতাংশ। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে আত্মহত্যাকে কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতা, পারিবারিক ব্যর্থতা বা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত কারণ ও ব্যাপ্তি বোঝা যাবে না; এটিকে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সংকট হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ বৈশ্বিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বে আনুমানিক ৭ লাখ ২৭ হাজার মানুষ আত্মহত্যায় মারা গেছেন। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যা বিশ্বে মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ। মোট আত্মহত্যার প্রায় ৭৩ শতাংশ ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই বছরের জন্য ডব্লিউএইচওর আনুমানিক হিসাব ৪ হাজার ৭১৪ মৃত্যু, অর্থাৎ দৈনিক গড়ে প্রায় ১৩ জন। তবে বাংলাদেশের জাতীয় ও পুলিশি তথ্যের সঙ্গে এই সংখ্যার বড় পার্থক্য রয়েছে। 

ডব্লিউএইচও নিজেই জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশের আত্মহত্যার মৃত্যুর তথ্যের মান ও নিবন্ধনব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।

বাংলাদেশে পুলিশের নথি বরং আরও বড় চিত্র দেখাচ্ছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে আত্মহত্যা প্রতিরোধের জাতীয় পরিকল্পনা নিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম) মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, ২০২০ থেকে ২০২৪ এই পাঁচ বছরে দেশে ৭৩ হাজার ৫৯৭টি আত্মহত্যাজনিত অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা পুলিশের নথিতে এসেছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে ১৪ হাজার ৭১৯টি এবং দিনে প্রায় ৪০টি ঘটনা। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আরও ১২ হাজার ৩৩৫টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা দৈনিক গড়ে প্রায় ৪১টির সমান। একই অনুষ্ঠানে বলা হয়, পুলিশের নথিতে আত্মহত্যার ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পদ্ধতি ফাঁস, এরপর বিষপান। তবে আত্মহত্যা ও আত্মহত্যাচেষ্টার সব ঘটনা পুলিশ বা হাসপাতালে নথিভুক্ত হয় না সামাজিক কলঙ্ক, পারিবারিক গোপনীয়তা ও আইনগত আশঙ্কার কারণে অনেক ঘটনা আড়ালে থেকে যেতে পারে।

আরও পড়ুন: জালিয়াতির তদন্তে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পদ ছাড়লেন পুতুল

যশোরের অবস্থান জাতীয় পরিসরেও বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ আইসিডিডিআর,বির উপস্থাপিত পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, ৬৪ জেলার মধ্যে আত্মহত্যাজনিত অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলার সংখ্যায় যশোর শীর্ষে। অক্টোবর ২০২২ থেকে অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত জেলায় এ ধরনের ১ হাজার ৪৫৪টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে ঢাকায় ১ হাজার ৪০২ এবং কুমিল্লায় ১ হাজার ২৮৮টি মামলা হয়েছে। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি ১ হাজার ৪৫৪টি মামলা হলো পুলিশি তথ্যের নির্দিষ্ট সময়সীমার হিসাব; এটিকে যশোরের ২০২০-২০২৫ সালের মোট আত্মহত্যার সংখ্যা হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না। অন্যদিকে ১৪ হাজার ৫১৬ হলো জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ২০২০-২০২৫ সালের আত্মহত্যাচেষ্টার স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব। দুটি পরিসংখ্যান ভিন্ন উৎস, ভিন্ন সময়সীমা ও ভিন্ন ধরনের ঘটনা নির্দেশ করে।

যশোরের পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আত্মহত্যার পেছনে একক কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া কঠিন। জেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণে পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি, আর্থিক সংকট, কর্মক্ষেত্রে হতাশা, সম্পর্কের টানাপড়েন এবং প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তরুণদের ক্ষেত্রে শিক্ষাজীবনের ফলাফল, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, সম্পর্কজনিত সংকট ও সামাজিক প্রত্যাশার চাপও ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সমাজবিজ্ঞানী হামিদুল হকের ব্যাখ্যায়, মানুষ যখন নিজের চাওয়া-পাওয়া ও বাস্তব প্রাপ্তির মধ্যে বড় ব্যবধান অনুভব করে এবং সেই চাপ মোকাবিলার সামাজিক বা পারিবারিক সহায়তা পায় না, তখন গভীর হতাশা তৈরি হতে পারে। 

তার মতে, আত্মহত্যা প্রতিরোধে কেবল একটি দিবসকেন্দ্রিক প্রচার নয়, পরিবার ও সমাজের দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর ঘাটতিও এই সংকটকে জটিল করছে। জাতীয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য ও সংবাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত জনবল মাত্র ১ দশমিক ১৭ জন এবং সরকারি খাতে নিবন্ধিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা প্রায় ৩৫০। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ১২ দশমিক ৬ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত; তাদের ৯২ শতাংশের বেশি কোনো ধরনের চিকিৎসা নেন না। এই সেবা-ঘাটতি আত্মহত্যা প্রতিরোধে দ্রুত ও সহজলভ্য সহায়তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় বাধা।

তবে যশোরে সম্পূর্ণ কোনো সেবা নেই বিষয়টি এমন নয়। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের কাছাকাছি পৌঁছে দিতে মনের বাড়ি নামে বিশেষ কর্নার চালু করা হয়েছে। যশোরের মনিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০২৩ সালে এই সেবা চালুর সময় প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের মাধ্যমে প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ এবং উচ্চতর কেন্দ্রে রেফারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। চৌগাছাসহ আরও কয়েকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও পরবর্তী সময়ে এই সেবা সম্প্রসারিত হয়। ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে মনিরামপুর, অভয়নগর, ঝিকরগাছা ও বাঘারপাড়াসহ সংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোতে মনের বাড়ি কার্যক্রমের মাধ্যমে ৪০০-এর বেশি মানুষকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার তথ্যও উঠে এসেছিল।

অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মানসিক স্বাস্থ্য কর্নারের অভিজ্ঞতাও বলছে, আত্মহত্যাচেষ্টার পর কাউন্সেলিং ও ফলোআপ গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকদের মতে, সংকটের মুহূর্তে শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীর মানসিক অবস্থা মূল্যায়ন, পরিবারের সঙ্গে আলোচনা এবং পরবর্তী সময়ে নিয়মিত খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকটের কারণে উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এই সেবা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। 

যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মাসুদ রানা জানিয়েছেন, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় বিদ্যমান চিকিৎসকদের প্রশিক্ষিত করে উপজেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যশোর ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট রয়েছেন বলেও তিনি জানিয়েছেন।

গ্রাম ও শহরের সংকটের ধরনেও পার্থক্য রয়েছে বলে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা মনে করছেন। গ্রামীণ এলাকায় কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষের সহজে ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসার বিষয়টি ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জাতীয় পর্যায়ের আত্মহত্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও উচ্চঝুঁকির কীটনাশক ও হার্বিসাইডের সহজলভ্যতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। দেশে ৩৪২ ধরনের কীটনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহারের কথা তুলে ধরে কিছু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উপাদানের ব্যবহার কমাতে পদক্ষেপ নেওয়ার তথ্যও জানানো হয়েছে। এমনকি কিছু কৃষি এলাকায় ব্যক্তিগতভাবে এসব রাসায়নিক মজুত না রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহারের মতো কমিউনিটিভিত্তিক ব্যবস্থার উদাহরণও আলোচনায় এসেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আত্মহত্যা প্রতিরোধে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি আত্মহত্যার সম্ভাব্য উপায়গুলোতে প্রবেশাধিকার কমানো, সংকটে থাকা মানুষকে দ্রুত শনাক্ত করা এবং সামাজিক সহায়তার নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেয়। সংস্থাটির মতে, আত্মহত্যার পেছনে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মানসিক, জৈবিক ও পরিবেশগত বহু ধরনের কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। আর আগের আত্মহত্যাচেষ্টা ভবিষ্যৎ ঝুঁকির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ফলে কেউ একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করলে তাকে শুধু ঘটনা হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার আওতায় আনা জরুরি।

এদিকে ২০২৬ সালের বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য Changing the narrative on suicide বাংলায় আত্মহত্যা সম্পর্কিত ধারণার পরিবর্তন। এ বছরের আহ্বান হলো নীরবতা ও ভুল ধারণার বদলে কথোপকথন শুরু করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য এবং এ জন্য ব্যক্তিগত পর্যায়ের সহায়তার পাশাপাশি নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনও প্রয়োজন। ১০ সেপ্টেম্বরের এই দিবসটি তাই শুধু শোভাযাত্রা বা আলোচনা সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বছরব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, জনসচেতনতা ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য সহজলভ্য সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করার তাগিদ দিচ্ছে।

দিবসটি উপলক্ষে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক সচেতনতামূলক আলোচনায় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এমএ মুহিত বলেন, আত্মহত্যা মোকাবিলায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এবং এককভাবে সরকারের পক্ষে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। 

তিনি জানান, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে পাবনা মানসিক হাসপাতালের আধুনিকায়ন, ঢাকার মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করা এবং কমিউনিটিভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো গড়ে তোলার কাজ চলছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও সেবা বিস্তারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা একই সঙ্গে আত্মহত্যার কথা বলা বা এমন ইঙ্গিত দেওয়া ব্যক্তির বক্তব্যকে হালকাভাবে না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। আঁচল ফাউন্ডেশনের লিড সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. সায়েদুল ইসলাম সাইদের মতে, আত্মহত্যার পেছনে সাধারণত একক কোনো কারণ থাকে না; নানা সমস্যা, চাপ ও সংকটের সম্মিলিত প্রভাবে একজন মানুষ চরম সিদ্ধান্তের দিকে যেতে পারেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তিদের অপরাধী হিসেবে না দেখে চিকিৎসা ও সহায়তার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকিয়াট্রি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মহসিন আলী শাহও সংকটে থাকা ব্যক্তিকে দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর কাছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। 

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার বলেছেন, ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে একা না রেখে পাশে থাকা এবং তাকে অপরাধী হিসেবে না দেখাই গুরুত্বপূর্ণ।

জাতীয় পর্যায়েও এখন আত্মহত্যা প্রতিরোধকে আরও সংগঠিত করার উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয় জানিয়েছে, ২০২৬-২০৩০ মেয়াদের একটি বহু খাতভিত্তিক জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ জোরদার করা হয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য আইন-২০১৮, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি-২০২২ এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২০-২০৩০-এর ভিত্তিতে পরিকল্পনাটি তৈরি হচ্ছে। এর অর্থ হলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একক উদ্যোগের বাইরে শিক্ষা, কৃষি, সমাজকল্যাণ, স্থানীয় সরকার, আইনশৃঙ্খলা ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতকে সমন্বিতভাবে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা নীতিনির্ধারণের পর্যায়েও স্বীকৃত হচ্ছে।

যশোরের ১৪ হাজার ৫১৬টি আত্মহত্যাচেষ্টার পরিসংখ্যান তাই কেবল একটি জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের সংখ্যা নয়; এটি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের ঝুঁকি, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক চাপ, সম্পর্কের টানাপড়েন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক সংকোচ এবং চিকিৎসক-স্বল্পতার মতো বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনায় না নিলে পরিস্থিতির পরিবর্তন কঠিন হবে। বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসের বার্তাও সেখানেই নীরবতা নয়, সংকটে থাকা মানুষের সঙ্গে কথা বলা; বিচার নয়, সহায়তা; বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি নয়, বছরজুড়ে কার্যকর ও সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা। যশোরের মতো উচ্চঝুঁকির জেলায় এই উদ্যোগগুলোকে আরও শক্তিশালী, ধারাবাহিক ও তথ্যভিত্তিক করা এখন সময়ের দাবি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়