আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১১:৩৯, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাভা সাগরে ২৪৩ আরোহীসহ জাহাজ নিখোঁজ, উদ্ধার অভিযান শুরু

জাভা সাগরে ২৪৩ আরোহীসহ জাহাজ নিখোঁজ, উদ্ধার অভিযান শুরু

ছবি: সংগৃহীত

ইন্দোনেশিয়ার জাভা সাগরে ২৪৩ জন আরোহী নিয়ে ভার্গো ট্রান্সপোর্ট ৮ নামে একটি যাত্রীবাহী জাহাজ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় বড় আকারের উদ্ধার অভিযান চলছে। পূর্ব জাভার সুরাবায়া থেকে বোর্নিও দ্বীপের দক্ষিণ কালিমন্তান প্রদেশের রাজধানী বানজারমাসিন যাওয়ার পথে শনিবার গভীর রাতে জাহাজটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। পরে জাহাজটির সর্বশেষ অবস্থানের কাছাকাছি এলাকায় উদ্ধারকারী দল পৌঁছে অভিযান শুরু করে। 

সর্বশেষ পাওয়া তথ্যে, রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১০৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। বাকি ১৪০ জনের সন্ধানে সমুদ্রপথে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার অনুসন্ধান ও উদ্ধার সংস্থা বাসারনাসের বানজারমাসিন কার্যালয়ের প্রধান এবং অভিযানের সমন্বয়কারী ই পুতু সুদায়ানা জানিয়েছেন, জাহাজটিতে মোট ২৪৩ জন ছিলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে যাত্রীর সংখ্যা ২৪০ বা ২৪১ বলা হলেও পরবর্তী উদ্ধার অভিযান ও যাত্রী তালিকার ভিত্তিতে ২৪৩ জনের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। জাহাজটি সুরাবায়া থেকে বানজারমাসিনের উদ্দেশে শনিবার যাত্রা শুরু করে। 

বাসারনাসের কাছে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি রাত প্রায় ২টার দিকে যোগাযোগের বাইরে চলে যায় এবং কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে পারে ভোরের দিকে।

জাহাজটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে সেটি জাভা সাগরের বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যে পড়েছিল বলে জানিয়েছে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান। 

বাসারনাসের প্রাথমিক তথ্যে বলা হয়েছে, জাহাজটির সর্বশেষ অবস্থান বানজারমাসিনের বাসিরিহ অনুসন্ধান ও উদ্ধার ঘাট থেকে প্রায় ৮০ নটিক্যাল মাইল বা ১৪৮ কিলোমিটার দূরে। আরও নির্দিষ্টভাবে, জাহাজটির সর্বশেষ শনাক্ত অবস্থান ছিল ৪°৩১৫১.৮২” দক্ষিণ অক্ষাংশ ও ১১৪°২৬.৮৮” পূর্ব দ্রাঘিমাংশ এলাকায়।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পাওয়ার পর বাসারনাস বানজারমাসিন থেকে দ্রুত উদ্ধারকারী দল পাঠায়। ছয় সদস্যের একটি প্রাথমিক দল রেসকিউ কারে করে বাসিরিহ ঘাটে যায় এবং সেখান থেকে কেএন এসএআর লক্ষ্মণা ২৪১ জাহাজে করে সম্ভাব্য সর্বশেষ অবস্থানের দিকে রওনা হয়। উদ্ধার অভিযানে পানি উদ্ধারের সরঞ্জাম, দুটি ডাইভিং সেট, যোগাযোগব্যবস্থা ও স্টারলিংকসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বানজারমাসিনের অনুসন্ধান ও উদ্ধার সংস্থা স্থানীয় বন্দর কর্তৃপক্ষ, নৌবাহিনী, পুলিশ, নেভিগেশন কর্তৃপক্ষ, পেলিন্দো এবং জাহাজটির স্থানীয় এজেন্টের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।

এদিকে উদ্ধার অভিযানের পরিধি আরও বাড়ানো হয়েছে। সুরাবায়া এসএআর কার্যালয় এইচআর-৩৬০১ হেলিকপ্টার এবং কেএন এসএআর ২৪৯ পারমাদি জাহাজ পাঠিয়েছে। হেলিকপ্টারটি পাঁচ সদস্যের ক্রু ও দুইজন উদ্ধারকর্মী নিয়ে সকাল ৮টা ২২ মিনিটে জুয়ান্ডা নৌঘাঁটির স্কোয়াড্রন ৪০০ থেকে রওনা হয়। 

অন্যদিকে কেএন এসএআর ২৪৯ পারমাদি তানজুং পেরাক বন্দর থেকে সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে যাত্রা করে। এতে ১১ জন ক্রু, চারজন উদ্ধারকর্মী এবং পূর্ব জাভা পুলিশের দুই সদস্য রয়েছেন। জাহাজটির ঘণ্টায় প্রায় ১৪ নট গতিতে সম্ভাব্য দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর কথা ছিল রাত সাড়ে ৯টার দিকে।

আরও পড়ুন: সৌদি ঘাঁটিতে হুতিদের হামলায় বন্ধ তেল পাইপলাইন

উদ্ধার অভিযানের মাঝেই পাওয়া গেছে বড় ধরনের অগ্রগতি। বাসারনাস জানিয়েছে, তিনটি জাহাজের মাধ্যমে মোট ১০৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। টিবি মাওহাও আইএক্স ১৬ জনকে উদ্ধার করে, যাদের মধ্যে ১৫ জন জীবিত এবং একজন মারা গেছেন। টিবি টিসিপি আরও ৩৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছে এবং এমভি হাইদা উদ্ধার করেছে ৪৯ জনকে। উদ্ধার হওয়া ১৬ জনকে নিয়ে মাওহাও আইএক্সের টুবান বন্দরের দিকে যাওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে টিসিপি ও এমভি হাইদায় উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বানজারমাসিনের ত্রিসক্তি বন্দরে নেওয়া হচ্ছে।

তবে উদ্ধার অভিযানের পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থল ও আশপাশের সমুদ্রে ঢেউয়ের উচ্চতা প্রায় ২ থেকে ২ দশমিক ৫ মিটার পর্যন্ত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ছোট আকারের উদ্ধারকারী নৌযান পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ কারণে তুলনামূলক বড় জাহাজগুলোকে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। 

বাসারনাসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আবহাওয়া ও সমুদ্র পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী উদ্ধারকারী নৌযান ও জনবল মোতায়েন করা হচ্ছে।

জাহাজটি শনিবার সুরাবায়া থেকে বানজারমাসিনের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। যাত্রাপথে আবহাওয়া খারাপ হওয়ার পর জাহাজটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বাসারনাসের কাছে জাহাজটির পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পিটি ভার্গো ইয়োয়েল রিহির পক্ষ থেকে বিষয়টি জানানো হয়। 

এপি জানিয়েছে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে খবর পৌঁছানোর পর জাহাজটির সম্ভাব্য সর্বশেষ অবস্থানের দিকে দ্রুত উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়। একই সঙ্গে আশপাশে চলাচলকারী অন্যান্য জাহাজকেও সতর্ক করা হয় এবং নিখোঁজ নৌযানটির কোনো চিহ্ন পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার কর্তৃপক্ষকে জানানোর জন্য অনুরোধ করা হয়।

ঘটনার পর বানজারমাসিনের ত্রিসক্তি বন্দরে নিখোঁজ জাহাজটির যাত্রীদের স্বজনদের ভিড় জমেছে। পরিবারের সদস্যরা জাহাজে থাকা স্বজনদের বিষয়ে তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন। কর্তৃপক্ষ তাদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছে এবং উদ্ধার অভিযান থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত আপডেট দেওয়ার কথা জানিয়েছে।

উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনার জন্য দক্ষিণ কালিমন্তান প্রাদেশিক পুলিশ বানজারমাসিনের ভায়াংকারা হাসপাতাল প্রস্তুত রেখেছে। উদ্ধার হওয়া যাত্রীদের অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে স্বজনদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের ব্যবস্থা করার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে জাহাজটি ঠিক কী কারণে বিপদে পড়েছে, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। তবে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য ও উদ্ধার কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক মূল্যায়নে খারাপ আবহাওয়া ও উত্তাল সমুদ্রকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাহাজটি ডুবে গেছে কি না, উল্টে গেছে কি না কিংবা অন্য কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাত্রীদের সাগরে নামতে হয়েছে কি না এসব বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে উদ্ধার অভিযান এখনো নিখোঁজ ১৪০ জনের সন্ধানকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হচ্ছে।

সুরাবায়া-বানজারমাসিন সমুদ্রপথ ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপগুলোর মধ্যে যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ একটি রুট। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দ্বীপপুঞ্জের দেশ ইন্দোনেশিয়ায় দ্বীপ থেকে দ্বীপে মানুষের চলাচল ও পণ্য পরিবহনে ফেরি ও যাত্রীবাহী জাহাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ভার্গো ট্রান্সপোর্ট ৮-এর এই দুর্ঘটনা দেশটির সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে বর্তমান পর্যায়ে দুর্ঘটনার কারণ, জাহাজটির প্রকৃত অবস্থা এবং নিখোঁজ যাত্রীদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনো হাতে নেই। 

উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো জানিয়েছে, অনুসন্ধান অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী আরও নৌযান ও আকাশযান যুক্ত করা হবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়