লেবাননে ইসরায়েলি হামলা: হাজার টন বিস্ফোরকে ৪.১ মাত্রার কম্পন
ছবি: সংগৃহীত
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলি আল-তাহের পাহাড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর একটি বিশাল ও সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ সামরিক কমপ্লেক্স সম্পূর্ণ ধ্বংস করার দাবি করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়, যার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে এর ফলে স্থানীয় ভূখণ্ডে ৪.১ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, আলি আল-তাহের পাহাড়ের নিচে হিজবুল্লাহর বিস্তীর্ণ টানেল ও ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে এক হাজার একশ টনেরও বেশি বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) এবং লেবাননের ভূকম্পন কেন্দ্র নিশ্চিত করেছে যে এই নিয়ন্ত্রিত ও বিশাল বিস্ফোরণের ফলে রিখটার স্কেলে ৪.১ মাত্রার সমপরিমাণ কম্পন সৃষ্টি হয়। এর অভিঘাত কেবল নাবাতিয়েহ অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের উপকূলীয় শহর সাইদা এবং লেবাননের মার্জয়ুন জেলার বিভিন্ন এলাকাসহ আশপাশের জনপদেও এর শক্তিশালী কম্পন ও বিকট শব্দ অনুভূত হয়। বিস্ফোরণের তীব্রতায় সৃষ্ট ধুলোবালি ও পাথরের স্তূপে এলাকার চারপাশের রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যায় এবং স্থানীয় গাছপালা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ এক যৌথ বিবৃতিতে এই অবকাঠামোকে হিজবুল্লাহর একটি কৌশলগত সন্ত্রাসী অবকাঠামো হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আরও পড়ুন: ইরানের দক্ষিণ উপকূলে দফায় দফায় বিস্ফোরণ
তাদের দাবি, গত দুই দশক ধরে ইরানের প্রত্যক্ষ অর্থায়ন ও পরিকল্পনায় এই জটিল ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছিল। এই সুড়ঙ্গগুলোর মোট দৈর্ঘ্য ছিল ৫ কিলোমিটারের বেশি (প্রায় ৫,৪০০ মিটার)। এর ভেতরে হিজবুল্লাহর অভিজাত বদর ইউনিট-এর প্রধান আঞ্চলিক কমান্ড সেন্টার অবস্থিত ছিল, যেখান থেকে ইসরায়েলের মেতুলা ও কিরিয়াত শমোনা এলাকায় নজরদারি ও সামরিক হামলার পরিকল্পনা করা হতো। অভিযানে টানেলের ভেতর থেকে প্রচুর পরিমাণে ইরানি ড্রোন, রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র, ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্র, মেশিনগান, মাইন এবং বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকসামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে।
আইডিএফ জানিয়েছে, গত সপ্তাহে অঞ্চলটির ওপরের অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সুড়ঙ্গের ভেতর অবস্থানকারী হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়েছিল। তবে তারা তা প্রত্যাখ্যান করে লড়াই চালিয়ে যাওয়ায় এবং সুড়ঙ্গ রক্ষার চেষ্টা করায় সেখানে সংঘর্ষ হয়। ইসরায়েলি বাহিনীর আকাশ ও কামান হামলায় প্রায় ৫০ জন হিজবুল্লাহ যোদ্ধা নিহত হন এবং বাকিরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এই নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ধ্বংস করার মাধ্যমে দক্ষিণ লেবাননে একটি স্থায়ী নিরাপত্তাবেষ্টনী বা বাফার জোন তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করেছে তেল আবিব।
উল্লেখ্য, গত মার্চ মাস থেকে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া তীব্র সংঘাতে এ পর্যন্ত চার হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি এবং কিছু বোঝাপড়া হলেও সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এমন ধ্বংসাত্মক অভিযান ও সামরিক তৎপরতা এখনও অব্যাহত রয়েছে। এই ঘটনার পর লেবানন সরকার বা হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে বিস্ফোরণ ও সংঘাতের আশঙ্কায় স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ ঘরবাড়ি ছেড়ে রাজধানী বৈরুতের দিকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান।
এই ভয়াবহ বিস্ফোরণের ফলে লেবাননের প্রধান ভূগর্ভস্থ ফল্ট লাইনগুলোর ওপর কোনো দীর্ঘমেয়াদী বা মারাত্মক ভূতাত্ত্বিক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে কি না, তা নিয়ে পরিবেশবিদ ও গবেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








