নতুন ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিশোধে জোর দিচ্ছে সরকার
ফাইল ছবি
দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় এক দূরদর্শী ও দায়িত্বশীল পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, যেখানে কেবল নতুন ঋণ সংগ্রহের প্রবণতা থেকে সরে এসে পুরোনো দায় পরিশোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ঋণের বোঝা কমানোর ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক ভিডিওবার্তায় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরে জানানো হয়েছে যে, সরকার তাৎক্ষণিক ও লোক দেখানো স্বস্তির পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ভিত্তি তৈরিতে কাজ করছে। অর্থনীতি কেবল ঋণ গ্রহণের অংকের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা সঠিকভাবে পরিশোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই প্রকৃত দায়িত্বশীলতা প্রমাণিত হয়।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনার যে হিসাব সামনে এসেছে, তাতে স্পষ্ট এক ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। আলোচ্য জুলাই মাসে বাংলাদেশ বৈদেশিক নতুন ঋণ হিসেবে মোট ১৮০ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ডলার লাভ করেছে। এর বিপরীতে, ইতিপূর্বে গৃহীত বিভিন্ন ঋণের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৪৫৩ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, জুলাই মাসে নতুন করে যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ দেশে এসেছে, তার চেয়ে ২৭৩ দশমিক ০৫ মিলিয়ন ডলার বেশি অর্থ পরিশোধ করেছে সরকার।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর বিপরীতে নতুন ঋণের অর্থ ছাড় বা প্রাপ্তি কমেছে ১৩ দশমিক ৩১ থেকে ১৩ দশমিক ৩৯ শতাংশের ঘরে। সরকারের নীতিগত অবস্থান বলছে, এই পরিসংখ্যানের মধ্য দিয়ে বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানোর প্রবণতা অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।
চলতি বছরের জুলাই মাসে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) এবং জাপান সরকারের পক্ষ থেকে নতুন অর্থ ছাড় অব্যাহত ছিল। যদিও একই সময়ে নির্দিষ্ট কিছু উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে নতুন কোনো অর্থ ছাড় আসেনি, তবুও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পুরোনো ঋণের দায় নিয়মিত পরিশোধের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়নি।
সরকারের মতে, এটি কেবল ঋণ লেনদেনের সাধারণ কোনো হিসাব নয়; বরং এর মাধ্যমে সরকারের সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের বার্তা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। দেশ এখন উন্নয়নের নামে কেবল নতুন অর্থ সংগ্রহের বৃত্তে আটকে নেই, বরং অতীতে তৈরি হওয়া দায়দেনা শোধ করার ক্ষেত্রেও সমানভাবে সক্রিয় রয়েছে।
আরও পড়ুন: ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি, শীর্ষে ইসলামী ব্যাংক
বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণ হিসেবে বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা অগণতান্ত্রিক ও ত্রুটিপূর্ণ নীতিকে দায়ী করা হচ্ছে। ভিডিওবার্তায় অতীতে দ্রুত উন্নয়ন ও সাময়িক স্বস্তির মোড়কে গৃহীত উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ চুক্তি, অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জর্জরিত ঋণনির্ভর মেগা প্রকল্পগুলোর তীব্র সমালোচনা করা হয়। অপরিকল্পিত এসব প্রকল্পের কারণে অর্থনীতিতে যে অপচয় ও দীর্ঘমেয়াদি বোঝা তৈরি হয়েছে, তার একটি বিশাল অংশের আর্থিক খেসারত এখনো দেশের সাধারণ মানুষকে বহন করতে হচ্ছে। ওই আমলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত ও দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ফলে বর্তমান সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতা এবং পূর্বের তৈরি করা অর্থনৈতিক বোঝা কাঁধে নিয়েই ধাপে ধাপে সামনে এগোতে হচ্ছে।
অর্থনীতির এই রূপান্তর ও কাঠামোগত সংস্কারের সময়কালে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে কিছু সাময়িক চাপ ও জটিলতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে সরকার স্বল্পমেয়াদি বা সাময়িক স্বস্তি অর্জনের নামে আবারও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাঁধে নতুন ঋণের পাহাড় চাপিয়ে দিতে নারাজ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি দেশবাসীর উদ্দেশে স্পষ্ট করে বলেছেন যে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ এবং শিল্পকারখানার উদ্যোক্তারা যে তীব্র কষ্ট ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, তার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
তিনি উল্লেখ করেন যে বিএনপি সরকার বর্তমানে দেশ পরিচালনার গুরুদায়িত্বে রয়েছে এবং এই সংকট নিরসনে নিরলস কাজ চলছে।
অর্থনীতিকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে বর্তমান প্রশাসন রিজার্ভ বৃদ্ধি, দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ উৎসগুলোর সুরক্ষায় জোর দিচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রার অর্জনকারী খাত যেমন প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এবং তৈরি পোশাক খাতে ইতিবাচক ধারা ফিরে আসতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও ধীরে ধীরে স্থায়িত্ব ও উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সরকারের মূল লক্ষ্য শুধু লোক দেখানো বা খণ্ডিত উন্নয়ন উপহার দেওয়া নয়; বরং এমন একটি আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা, যেখানে দেশের বর্তমান ও আগামীর প্রজন্ম বৈদেশিক ঋণের জালে আবদ্ধ না হয়ে নিজেদের অর্থনীতি, নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব নিয়ে মাথা উঁচু করে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়াতে পারে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








