ট্রাকের পেছনে আঁকা ছবি নয়, বাবার প্রতীক্ষায় থাকা এক সন্তানের গল্প
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের লজিস্টিকস ও পণ্য পরিবহন খাতের পরিচিত চিত্রপটকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়ে একটি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও নজিরবিহীন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী উর্মি গ্রুপ। সাধারণত দেশের মহাসড়কগুলোতে চলাচলকারী ভারী পণ্যবাহী ট্রাক বা কাভার্ডভ্যানের পেছনে নানা প্রথাগত উক্তি, স্লোগান বা ছবি দেখা যায়। তবে এর বাইরে গিয়ে এবার প্রতিষ্ঠানটি তাদের নিজস্ব লজিস্টিকস বহরের ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানগুলোতে যুক্ত করেছে এক মানবিক মাত্রা। এই অভিনব উদ্যোগের অংশ হিসেবে গাড়িগুলোর পেছনে স্থান পেয়েছে চালকদের নিজ সন্তানদের আঁকা নানা রঙের ছবি ও তাদের মনের কোঠায় জমে থাকা কিছু না বলা কথা।
মূলত ট্রাকচালকদের পেশাগত জীবনের ক্লান্তি দূর করতে, তাদের কাজের প্রতি সম্মান জানাতে এবং সমাজের প্রচলিত নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে প্রায় সময়ই পণ্যবাহী ভারী ট্রাক ও এর চালকদের নিয়ে একধরনের ভীতি কিংবা নেতিবাচক ধারণা কাজ করে। মহাসড়কে দ্রুতগতির ট্রাক দেখলে অনেকে সেটিকে বেপরোয়া বা বিপজ্জনক মনে করেন। কিন্তু এই উদ্যোগের ফলে সেই ধারণার মূলে এক বিশাল পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। যখন কোনো পথচারী বা চালক একটি ট্রাকের পেছনে কোনো শিশুর রঙিন আঁকা ছবি ও তার বাবার উদ্দেশে লেখা আবেগঘন পঙক্তি দেখতে পান, তখন সেই গাড়িটি কেবল একটি যান্ত্রিক যানবাহন থাকে না; বরং এটি হয়ে ওঠে একটি পরিবারের ভালোবাসা, প্রত্যাশা ও অপেক্ষার জীবন্ত প্রতীক।
এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় মানসিক ও সামাজিক গুরুত্ব লুকিয়ে আছে এর প্রভাবে। ট্রাকচালকরা দিনের পর দিন ঘর-পরিবার ছেড়ে হাজার মাইল দূরে পণ্য পরিবহন করেন। তাদের এই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাত্রায় সন্তানের আঁকা ছবিটি চালকের মনে এক গভীর মানসিক প্রশান্তি ও প্রেরণা জোগায়। ছোট্ট শিশুর আঁকা ছবির প্রতিটি রঙে মিশে থাকে তাদের অজস্র স্বপ্ন আর ভালোবাসা। গাড়ির গায়ে দৃশ্যমান থাকা সেই ছবি ও বার্তা চালকদের প্রতিনিয়ত একটি নীরব মনে করিয়ে দেয় যে গন্তব্যে শুধু পণ্য পৌঁছানোই দায়িত্ব নয়, নিরাপদে প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাওয়াটাও সমান জরুরি।
কোনো শিশুর হয়তো খুব সরল একটি আকূতি লেখা থাকে “বাবা, তুমি রাস্তায় সাবধানে থেকো। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।” কিংবা “প্রিয় বাবা, যদি বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস কী, তাহলে আমি মাথা উঁচু করে বলবো আমার বাবা।” এই ছোট ছোট কথাগুলো চালককে বেপরোয়া গাড়ি চালানো থেকে বিরত রাখে এবং আরও সচেতনভাবে স্টিয়ারিং ধরতে বাধ্য করে।
উর্মি গ্রুপের এই ব্যতিক্রমী সামাজিক দায়বদ্ধতা বা এসএসজি (Sustainability) কাঠামোর অংশ হিসেবে শ্রমিক কল্যাণ ও পারিবারিক সংযোগের এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে। এর আগে উর্মি গ্রুপ তাদের কারখানায় কর্মীদের সন্তানদের জন্য বিশ্বমানের চাইল্ড কেয়ার বা ডে-কেয়ার সেন্টার উর্মি আস্থার মতো যুগান্তকারী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে করপোরেট অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় লজিস্টিকস খাতের পেছনের কারিগর তথা চালক ও তাদের পরিবারের মানসিক বিকাশের কথা ভেবে এই চিত্রকর্ম প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সাধারণত দেশের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের মৌলিক অধিকার ও কর্মপরিবেশ উন্নত করার ওপর জোর দিলেও, চালকদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং তাদের সন্তানদের সৃজনশীলতার স্বীকৃতি দেওয়ার এমন দৃষ্টান্ত বেশ বিরল।
এই উদ্যোগের সুদূরপ্রসারী প্রভাব কেবল চালক বা তাদের পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সমগ্র সমাজের লজিস্টিকস সংস্কৃতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। শ্রমজীবী মানুষের সন্তানদের প্রতিভা ও চিত্রকর্মকে এভাবে বড় পরিসরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ায় একদিকে যেমন তাদের সৃজনশীলতার মূল্যায়ন হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের সাথে চালকদের দূরত্ব ঘুচে তৈরি হচ্ছে এক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।
দেশের প্রথম সারির অন্যান্য সংবাদমাধ্যম ও করপোরেট বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ কর্মক্ষেত্রকে আরও সমতাভিত্তিক, সহানুভূতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলে।
পরিশেষে, উর্মি গ্রুপের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে ব্যবসা কেবল মুনাফা অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং মানুষের জীবনকে ছোঁয়া এবং সম্পর্কের বন্ধনকে সুদৃঢ় করার এক বিশাল ক্যানভাস। মহাসড়কের প্রতিটি ধূলিমলিন যাত্রার শেষে যেন একটি হাসিমুখ অপেক্ষা করে এই প্রদীপ্ত বার্তার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি দেশের পরিবহন ও শিল্প খাতে এক অনুকরণীয় ও অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








