নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১২:৫৫, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আ. লীগের নিষেধাজ্ঞার বৈধতা চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ

আ. লীগের নিষেধাজ্ঞার বৈধতা চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ

ফাইল ছবি

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গ, সহযোগী এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে ২০২৫ সালের ১২ মে জারি করা সরকারি প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। 

রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রিটটি উত্থাপিত হয়নি মর্মে খারিজ করে দেন। ফলে রিটটির মাধ্যমে ওই প্রজ্ঞাপনের বৈধতা নিয়ে আদালতের মূল বিচারিক পর্যালোচনা আর এগোয়নি।

রিট আবেদনকারী ছিলেন মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরের বাসিন্দা মো. আল আমিন। গত ৭ সেপ্টেম্বর তিনি হাইকোর্টে আবেদনটি দায়ের করেন। রিটের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট ইউনূস আলী। আবেদনটির প্রার্থনায় ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনটি কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়ে রুল জারির আবেদন করা হয়। একই সঙ্গে রুলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই প্রজ্ঞাপনের কার্যক্রম স্থগিত রাখারও আবেদন জানানো হয়েছিল। ৭ সেপ্টেম্বর রিটটি বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার বেঞ্চের কার্যতালিকায় ছিল; সেদিন নির্ধারিত ক্রম পর্যন্ত শুনানি না পৌঁছানোয় বিষয়টির শুনানি হয়নি। পরে রোববার বেঞ্চ রিটটি উত্থাপিত হয়নি মর্মে খারিজ করেন।

আদালতের আদেশের পর আইনজীবী নূরনবী বুলবুল সাংবাদিকদের বলেন, আদালতে তারা যুক্তি দিয়েছেন যে রিটকারী মো. আল আমিন আওয়ামী লীগের কেউ নন। এ কারণে এ ধরনের রিট করার আইনগত অধিকার তার নেই এ বক্তব্য আদালতের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। রিটের পক্ষে আইনজীবী ইউনূস আলী আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মোহাম্মদ আজমী।

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপনটি জারি করা হয়েছিল ২০২৫ সালের ১২ মে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ ওই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সংগঠনগুলোর সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। প্রজ্ঞাপনটি অবিলম্বে কার্যকর করার কথা বলা হয়। 

সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে দীর্ঘ সময় ধরে সংঘটিত হত্যা, নির্যাতন, গুম, নিপীড়নসহ গুরুতর অপরাধের অভিযোগের বিচার প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

ওই প্রজ্ঞাপনে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আওয়ামী লীগ ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর প্রকাশনা, গণমাধ্যমে প্রচার, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা, মিছিল, সভা-সমাবেশ, সম্মেলন আয়োজনসহ যাবতীয় কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞাটি শুধু দলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; দল ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর প্রচার-প্রকাশনা এবং অনলাইন কার্যক্রমও এর আওতায় আনা হয়।

এই নিষেধাজ্ঞার আইনি ভিত্তি তৈরি করা হয় সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এ সংশোধন এনে। ২০২৫ সালের ১১ মে সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরদিন জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশের মাধ্যমে কোনো সত্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার আইনি ক্ষমতা সরকারের জন্য আরও স্পষ্ট করা হয়। এরপর সেই ক্ষমতার ভিত্তিতেই ১২ মে আওয়ামী লীগ ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

সরকারের ওই সিদ্ধান্তের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন স্থগিত করে। কমিশনের গেজেট অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ৩ নভেম্বর দেওয়া আওয়ামী লীগের নিবন্ধন নম্বর ০০৬ স্থগিত করা হয়। 

নির্বাচন কমিশন জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞার ধারাবাহিকতায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রয়োজন হওয়ায় নিবন্ধন স্থগিতের সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগের নির্বাচনী কার্যক্রমের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলে।

আরও পড়ুন: ড. ইউনূসকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করতে হবে: হাইকোর্ট

সরকার পরে নিষেধাজ্ঞার পরিধি নিয়েও স্পষ্ট অবস্থান জানায়। ২০২৫ সালের ১৩ মে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার অর্থ অন্য রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা নয়। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সংশ্লিষ্টদের বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ, এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের প্রকাশনা, প্রচারণা, সভা-সমাবেশ, মিছিল ও সম্মেলনসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে।

নিষেধাজ্ঞার পর আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম বন্ধের উদ্যোগও নেওয়া হয়। জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা আওয়ামী লীগ এবং দলটির সংশ্লিষ্ট ও সহযোগী সংগঠনগুলোর ওয়েবসাইট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হ্যান্ডেল ব্লক বা অপসারণের জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে অনুরোধ করেছিল।

২০২৬ সালেও নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে সরকারি অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় দলটি অন্য কোনো নাম বা ব্যানার ব্যবহার করেও কর্মসূচি পালন করতে পারবে না। রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ, নতুন আওয়ামী লীগ বা গ্রাসরুটস আওয়ামী লীগ যে নামেই হোক, নিষেধাজ্ঞার মেয়াদে দলীয় কার্যক্রম চালানোর সুযোগ নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। নিষেধাজ্ঞা কতদিন বহাল থাকবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের বিষয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এর মধ্যেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আওয়ামী লীগ ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতা-কর্মীদের কর্মসূচি পালনের ঘটনাও সামনে এসেছে। চলতি সেপ্টেম্বরেই ঢাকার গুলশানে আওয়ামী লীগ কর্মীদের একটি মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ অভিযান চালায়। 

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই কর্মসূচিতে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন অংশ নিয়েছিলেন এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার এবং দুজনকে আটক করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর উত্তর ইউনিট ওই মিছিল আয়োজনের কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বীকার করেছিল।

দেশের বিভিন্ন স্থানেও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার অব্যাহত রয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে নেত্রকোনায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ১৩ নেতা-কর্মীকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এসব ঘটনায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দায়ের করা মামলা ছাড়াও স্থানীয় বিভিন্ন ঘটনার মামলা রয়েছে।

এদিকে ২০২৫ সালের মে মাসে কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন স্থগিতের পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। সরকারের নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি হিসেবে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধিত বিধান এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন অভিযোগগুলোর বিষয়টি সামনে থাকলেও, আজকের হাইকোর্টের আদেশে ওই প্রজ্ঞাপনের বৈধতা নিয়ে বিস্তারিত বিচারিক সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। বরং রিটটি উত্থাপিত হয়নি মর্মে খারিজ হওয়ায় আবেদনটির মাধ্যমে প্রজ্ঞাপনটি আইনগতভাবে বৈধ না অবৈধ সে প্রশ্নে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় আসেনি।

ফলে ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ, সহযোগী এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখার ২০২৫ সালের ১২ মে-এর সরকারি প্রজ্ঞাপন বহাল রয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনও স্থগিত রয়েছে। সর্বশেষ রিটটি খারিজ হওয়ায় ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা স্থগিতের কোনো আদালতীয় নির্দেশও আসেনি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়