নুসরাত হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হাইকোর্টের
ছবি: সংগৃহীত
ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা মামলার বহুল আলোচিত ডেথ রেফারেন্স ও আপিল মামলার ১১২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (০৮ সেপ্টেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে এই পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করা হয়। এর আগে গত ২৪ আগস্ট বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেছিলেন।
প্রকাশিত রায়ে বিচারিক আদালতের দেওয়া ১৬ জন আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় পরিবর্তন করে দুজনকে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা, চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অপর ১০ আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় বিচারিক আদালত কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির মধ্যে হাইকোর্ট মাত্র দুজনকে সর্বোচ্চ সাজা বা মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন।
মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা এই দুই আসামি হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদদৌলা (৫৭) এবং হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণকারী শাহাদাত হোসেন শামীম (২০)। এছাড়া চার আসামির মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এই চারজন হলেন নূর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জুবায়ের এবং উম্মে সুলতানা ওরফে পপি।
অন্যদিকে, মামলার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় এবং সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের দৃষ্টিতে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনি ভিত্তি না থাকায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১০ আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। খালাসপ্রাপ্ত ১০ জন হলেন কামরুন নাহার মনি (যিনি ঘটনার সময় গর্ভবতী ছিলেন), হাফেজ মোহাম্মদ আবদুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, আব্দুর রহিম শরীফ, মোহাম্মদ শামীম, ইফতেখার উদ্দিন রানা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি ও মাদ্রাসার সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল আমিন, আবছার উদ্দিন এবং তৎকালীন কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর।
রায়ের বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল গণমাধ্যমকে বলেন, হাইকোর্ট বিভাগ অত্যন্ত চুলচেরা বিশ্লেষণ করে এই মামলার রায় প্রদান করেছেন। যে ১০ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও গ্রহণযোগ্য কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ বা অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন: জামিন মেলেনি সেই সিফাত আব্দুল্লাহর
পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারিক আদালতের বিচারক এবং সামগ্রিক বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে অত্যন্ত কঠোর ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, বিচারিক আদালতের তৎকালীন বিচারক মামুনুর রশিদ একটি বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কোনো ধরনের বিচারিক মনন বা জুডিশিয়াল মাইন্ড প্রয়োগ না করে যান্ত্রিকভাবে ১৬ জনকেই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। হাইকোর্ট এই রায়কে মাইন্ডলেস সেন্টেন্স বা বিবেকহীন সাজা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
রায়ে বলা হয়েছে, বিচারক মামলার ঘটনায় কার কতটুকু সুনির্দিষ্ট সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং কার কী ধরনের অপরাধ ও ভূমিকা ছিল, তা সম্পূর্ণ আমলে নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। এই গুরুতর পর্যবেক্ষণ ও দায়িত্বে অবহেলার কারণে বিচারক মামুনুর রশিদকে অবিলম্বে ফৌজদারি মামলার বিচারকার্য পরিচালনা এবং আসামিদের দণ্ড বা সাজা দেওয়ার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদদৌলার বিরুদ্ধে মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রী ও নুসরাতকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন তার মা শিরীন আখতার। ওই মামলার জেরে পুলিশ অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করলে তার অনুসারী ও ক্যাডার বাহিনী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে কারাগারে বসেই অধ্যক্ষকে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনা এবং নুসরাতকে শায়েস্তা করার জন্য নানামুখী পরিকল্পনা করা হয়। এর অংশ হিসেবে ৩ এপ্রিল কারাগারে অধ্যক্ষের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ৪ এপ্রিল ছাত্রাবাসে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়।
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, ওই বছরের ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে কৌশলে নুসরাতকে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যার চেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। পরবর্তীতে তাকে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে ফেনী সদর হাসপাতাল হয়ে অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। সেখানে টানা পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ১০ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সাহসী নুসরাত।
এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল সোনাগাজী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটির তদন্ত শেষে পুলিশ মোট ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে একই বছরের ২৮ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে এবং ২০ জুন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। বিচারিক আদালত মাত্র ৬১ কার্যদিবসে দীর্ঘ শুনানি ও ৮৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ এবং যুক্তিতর্ক সম্পন্ন করে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর রায় ঘোষণা করেছিলেন, যেখানে সব আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের ওপর দীর্ঘ শুনানি শেষে হাইকোর্ট বিভাগ এই রায় ঘোষণা ও প্রকাশ করলেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








