মার্কিন শুল্কের চাপে ৭ মাসে বাংলাদেশি পোশাকের দাম কমেছে ২.২৬%
ফাইল ছবি
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাকের বাজার যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই ২০২৬) পোশাক আমদানিতে বড় ধরনের সংকোচন দেখা দিয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলস (ওটেক্সা)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমে ৪১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। বাজার সংকুচিত হওয়ার এই প্রভাবে বাংলাদেশের রফতানিও হোঁচট খেয়েছে, তবে প্রধান প্রতিযোগী চীন ও ভারতের তুলনায় পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় বাংলাদেশ বাজারটিতে দ্বিতীয় বৃহত্তম অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
ওটেক্সার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ৪৫ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছিল, চলতি বছরের একই সময়ে তা প্রায় ৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার কমে ৪১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আমদানির পরিমাণের দিক থেকেও বড় পতন ঘটেছে। গত বছরের প্রথম সাত মাসে প্রায় ১৪ দশমিক ১৯৪৭ বিলিয়ন বর্গমিটার সমতুল্য পোশাক আমদানি হলেও, চলতি বছরে তা কমে ১৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন বর্গমিটারে নেমেছে যা পরিমাণে ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ কম।
তবে এই পতনের মধ্যেও গড় একক আমদানি মূল্য সামান্য বেড়েছে শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ (৩ দশমিক ১৪ ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৩ দশমিক ১৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে)। এতে এটি স্পষ্ট যে, মার্কিন বাজারে সামগ্রিক পোশাকের গড় মূল্য সামান্য বৃদ্ধি পেলেও চাহিদার ও আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাসের কারণে সামগ্রিক ভোগের প্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজার সংকোচনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে। জানুয়ারি-জুলাই ২০২৫ সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করেছিল, যা চলতি বছরের একই সময়ে কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ, সাত মাসের ব্যবধানে রফতানি কমেছে প্রায় ৩২৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার বা ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। পরিমাণের দিক থেকেও বাংলাদেশ থেকে রফতানি ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন বর্গমিটারে নেমেছে।
যদিও সামগ্রিক মার্কিন বাজারের ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ পতনের তুলনায় বাংলাদেশের রফতানি হ্রাসের হার কম, তবুও জুলাই মাসের একক তথ্য পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুলাই মাসেই বাংলাদেশের রফতানি ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে গেছে। ফলে বছরের প্রথম সাত মাসের গড় পতনের গতির তুলনায় জুলাইয়ে পতন ত্বরান্বিত হওয়ায় আগামী দিনগুলোতে রফতানি প্রবাহ কোন দিকে মোড় নেবে তা নিয়ে নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
আরও পড়ুন: জ্বালানিসংকট ও অর্ডারের অভাবে বন্ধ ৪০০ পোশাক কারখানা
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধস নেমেছে চীনের ওপর। সাত মাসে চীনের রফতানি ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। ভারতের রফতানিও ২৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ কমে ২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে। ভিয়েতনামের রফতানি কমেছে সামান্য– ১ দশমিক ০৩ শতাংশ (৯ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার)। তবে সংকোচনশীল বাজারের মধ্যেও ইন্দোনেশিয়া (২ দশমিক ৭৬ শতাংশ) এবং কম্বোডিয়া (১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ) ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
রফতানিকারক ও খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাকের গড় দাম ও রফতানি মূল্য হটার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে মার্কিন প্রশাসনের রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা বাড়তি শুল্কের চাপ। চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের এই অতিরিক্ত শুল্কের হার ২০ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর ছিল। আদালতের হস্তক্ষেপে কিছু পরিবর্তন আসলেও ১০ শতাংশ শুল্ক বহাল থাকে। স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম জানান, এই বাড়তি শুল্কের পুরো বোঝা মার্কিন ক্রেতাদের ওপর চাপানো সম্ভব না হওয়ায় রফতানিকারকদের একটি অংশ (কোথাও এক-তৃতীয়াংশ আবার কোথাও অর্ধেক) নিজেদের বহন করতে হয়েছে। এর ফলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অনেক কারখানাকে পণ্যের দাম কমাতে বাধ্য হতে হয়েছে। ওটেক্সার উপাত্ত অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশের পোশাকের গড় একক মূল্য ২ দশমিক ২৬ শতাংশ কমেছে
আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম ও রফতানি মূল্য যখন নিম্নমুখী, ঠিক তখনই দেশের ভেতরে পোশাক খাতের উৎপাদন ব্যয় পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটছে। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান যে, গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট এবং উচ্চমূল্যের কারণে অনেক কারখানাকে তিন-চার গুণ বেশি দামে বিকল্প জ্বালানি বা ডিজেল কিনে উৎপাদন সচল রাখতে হচ্ছে। এছাড়া শ্রম ও অন্যান্য উপকরণের মূল্যবৃদ্ধিও খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
একদিকে ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয় এবং অন্যদিকে বিদেশি ক্রেতাদের কম দামের দাবির জাঁতাকলে পড়ে অনেক উদ্যোক্তা লোকসানে ক্রয়াদেশ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে দেশের বহু পোশাক কারখানা রুগ্ণ হয়ে পড়েছে এবং অনেকগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই দ্বির্মুখী চাপ দীর্ঘমেয়াদে দেশের পুরো শিল্পের জন্যই বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
সব সূচক নেতিবাচক না হলেও, চীন ও ভারতের মতো বৃহৎ সরবরাহকারীদের বাজারে বড় পতনের ফলে সৃষ্ট শূন্যস্থান বা সাপ্লাই চেইন পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক এবং বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, চীন ও ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের রফতানি কম কমা একটি ইতিবাচক দিক। এছাড়া শুল্কের বোঝা ভাগাভাগি করার চাপও কিছুটা কমে আসায় মার্কিন ক্রেতারা এখন আর আগের মতো অতিরিক্ত ছাড় চাচ্ছেন না, যা ভবিষ্যতে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ তৈরি করছে।
তবে এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে কেবল কম দামে পণ্য বিক্রি করার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। উৎপাদন ব্যয় কমানো, কারখানার কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি, পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ (বিশেষ করে ম্যান-মেড ফাইবার বা কৃত্রিম ফাইবারের পোশাকের প্রসার) এবং উচ্চমূল্যের পোশাক রফতানিতে সুনির্দিষ্ট কৌশলগত জোর দেওয়ার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাজারে সরবরাহ সক্ষমতা ও মান বজায় রাখতে না পারলে ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো উদীয়মান প্রতিযোগীদের ভিড়ে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








