পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ যুক্তরাজ্যের
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড। ছবি: সংগৃহীত
অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনিদের ওপর উচ্ছেদ ও সহিংসতা এবং আন্তর্জাতিক আইন লংঘনের বিরুদ্ধে অন্যতম কঠোর ও বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাজ্য।
দেশটির পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্সে এক ঐতিহাসিক ভাষণে এই যুগান্তকারী নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়েছেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড।
এই পদক্ষেপে যুক্তরাজ্য কেবল কূটনৈতিক সমালোচনা বা উদ্বেগের গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি কার্যকারী পদক্ষেপে প্রবেশ করেছে। ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সমর্থিত দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান টিকিয়ে রাখতে এই ঘোষণা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের একাংশের সাথে সমন্বয় করে এবং ফ্রান্স ও কানাডার যৌথ ঘোষণায় শামিল হয়ে ব্রিটিশ সরকার বেশ কিছু কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতিগুলোতে উৎপাদিত যেকোনো পণ্য যুক্তরাজ্যে প্রবেশ বা বাজারে বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা এবং বসতি অঞ্চলের পণ্যের যেকোনো ধরনের বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা। পাশাপাশি বসতি সম্প্রসারণের সঙ্গে সরাসরি জড়িত নির্মাণকাজ, অবকাঠামো উন্নয়ন, রিয়েল এস্টেট এবং আর্থিক সেবা প্রদানকারী নির্দিষ্ট কোম্পানি ও ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে একটি বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।
ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও উসকানিদাতা হিসেবে চিহ্নিত উগ্র বসতিস্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি ইসরায়েলের দখলদারিত্বকে বা বসতি নির্মাণকে বস্তুগতভাবে সহায়তা করে এমন যেকোনো ধরনের সামরিক অস্ত্র লাইসেন্স বা রপ্তানি আবেদন পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। লেবাননের হিজবুল্লাহর অর্থায়নকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠান 'আল-কার্দ আল-হাসান'-এর ওপরও একই দিনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: সৌদি আরবে জ্বালানি স্থাপনায় হুতিদের হামলায় আহত ৭৩
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড অত্যন্ত কড়া ভাষায় অভিযোগ করেন যে, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা সরকারি প্রচ্ছায়া ও নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর জাতিগত নির্মূল বা জাতিগত নিধন চালাচ্ছে।
বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া, রাস্তাঘাট ধ্বংস এবং সাধারণ মানুষকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি জানান, যুক্তরাজ্য সরকার এখন আনুষ্ঠানিকভাবে এই অবস্থান নিয়েছে যে পশ্চিম তীরের পুরো দখলদারিত্ব আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অবৈধ। ইসরায়েল সরকারের বিতর্কিত নতুন বসতি স্থাপন প্রকল্প বিশেষ করে কৌশলগত ই-১ এলাকায় প্রায় ১,২০০ নতুন আবাসন তৈরির পরিকল্পনা পশ্চিম তীরের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে চিরতরে ভেঙে দেবে এবং এর ফলে ফিলিস্তিনে একটি স্বাধীন ও টেকসই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা চিরতরে নস্যাৎ হয়ে যাবে। এই ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবীয় বিপর্যয় দেখে যুক্তরাজ্য আর নীরব দর্শক বা নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন মিলিব্যান্ড।
যুক্তরাজ্যের এই নীতির পরিবর্তন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক ধাক্কা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলে এই পদক্ষেপে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার পাশাপাশি ডেনমার্ক, স্পেন, ফিনল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল ও সুইডেনসহ মোট ১২টি দেশ যৌথ বিবৃতিতে সংহতি প্রকাশ করেছে। তবে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেল আবিব ও ওয়াশিংটন। ইসরায়েলি সরকার এই সিদ্ধান্তকে ঘোর বিরোধিতা করে কড়া জবাবের হুশিয়ারি দিয়েছে। দেশটির অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ তেল আবিবে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে অবিলম্বে বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছেন এবং জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ অভিযোগ করেছেন যে, আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় ইসরায়েলি নির্বাচনে যুক্তরাজ্য হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে এবং ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রিটিশ পরিকল্পনার দ্ব্যর্থহীন বিরোধিতা করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের মধ্যে বার্ষিক প্রায় ৬ বিলিয়ন পাউন্ড বাণিজ্যের বিশাল সমীকরণে এই নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞার সরাসরি বড় ধরনের নেতিবাচক আঘাত পড়ার সম্ভাবনা কম, কারণ এটি পুরো ইসরায়েলকে নয় বরং কেবল অবৈধ বসতি অঞ্চলগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তবে মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ব্যবহারিক প্রয়োগ নিয়ে যুক্তরাজ্য কীভাবে বাজার বা সুপারমার্কেটে আসা পণ্যের ক্ষেত্রে খোদ ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডের উৎপাদনের সাথে পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতি অঞ্চলের পণ্যের সুনির্দিষ্ট পার্থক্য করবে, তার বিস্তারিত প্রক্রিয়া এবং আইনগত কাঠামো কার্যকর করা বেশ জটিল হতে পারে। তা সত্ত্বেও, জুলাই মাসে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়া এড মিলিব্যান্ডের এই পদক্ষেপ যুক্তরাজ্যকে মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতিতে এক নতুন ও কঠোর অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








