ইন্দোনেশিয়ায় অগ্ন্যুৎপাতে বিমান চলাচল ও জনজীবন বিপর্যস্ত
ছবি: সংগৃহীত
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থিত সুন্দা প্রণালির অন্যতম সক্রিয় ও আলোচিত আগ্নেয়গিরি আনাক ক্রাকাতাউ-তে ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটেছে। গত শুক্রবার (০৫ সেপ্টেম্বর) শেষ রাতে শুরু হওয়া এই আকস্মিক বিস্ফোরণ ও তীব্র ভূকম্পন সপ্তাহান্তে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। আগ্নেয়গিরি থেকে অবিরাম লাভার ফোয়ারা উদগীরণ এবং বিকট শব্দ হওয়ার পাশাপাশি এর গর্জনের রেশ প্রায় ৭০০ কিলোমিটার বা ৪৩৫ মাইল দূর পর্যন্ত অনুভূত হয়েছে। এর ফলে রাজধানী জাকার্তাসহ দেশটির বিস্তীর্ণ আকাশসীমা ও জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত বিষাক্ত ছাই ও ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ায় দেশটির বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে রাজধানী জাকার্তার প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সোয়েকার্নো-হাত্তা এবং সামরিক ও বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হালিম পারদানাকুসুমাসহ মোট আটটি বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে।
ইন্দোনেশিয়ার পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এই বিপর্যয়ের ফলে দেশটিতে ১ হাজার ৫৫৮টির বেশি ফ্লাইট বাতিল, বিলম্বিত কিংবা ভিন্ন রুটে পরিচালিত হয়েছে। এর মধ্যে কেবল জাকার্তার সোয়েকার্নো-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকেই ৯ শতাধিক ফ্লাইট বিঘ্নিত হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার বিমানযাত্রী চরম দুর্ভোগ ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। এই আকস্মিক ফ্লাইট বাতিলের প্রধান প্রভাব পড়েছে সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর, দোহা এবং সিডনির মতো আন্তর্জাতিক রুটগুলোতে। সিংগাপুর এয়ারলাইন্স ও মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সসহ শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলো জাকার্তাগামী তাদের নির্ধারিত ফ্লাইটগুলো স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি পরিবর্তনশীল থাকায় বিমানবন্দরগুলোর কার্যক্রম পুনরায় চালুর সময়সীমা দফায় দফায় পিছিয়ে সোমবার সন্ধ্যা ও মধ্যরাত পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। যাত্রীদের বিকল্প যাতায়াত নিশ্চিত করতে সেমারাং ও সুরাবায়াসহ আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলো এবং নিকটবর্তী ট্রেন রুটগুলোকে বিকল্প হিসেবে প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া ও ভূ-পদার্থবিজ্ঞান সংস্থা জানিয়েছে, আগ্নেয়গিরির উদগীরিত ছাই জাভা দ্বীপের আকাশে প্রায় ৬ হাজার মিটার বা ২০,০০০ ফুট এবং সুমাত্রা দ্বীপ ও বানতেন প্রদেশের দিকে প্রায় ১৫ হাজার মিটার বা ৫০,০০০ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন: মিয়ামি বিমানবন্দরে অ্যামাজনের কার্গো বিমান বিধ্বস্তে নিহত ৫
পেন্টাগন ও বিমান বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের মতে, বাতাসে ভেসে বেড়ানো এই ধরনের সূক্ষ্ম ভলকানিক অ্যাশ বা আগ্নেয় ছাই উড়োজাহাজের শক্তিশালী জেট ইঞ্জিনের অভ্যন্তরীণ মেকানিজমে প্রবেশ করে টারবাইন ব্লেড দ্রুত ক্ষয় করে দিতে পারে, ফুয়েল ও এয়ার সিস্টেম আটকে ফেলতে পারে এবং যেকোনো মুহূর্তে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে।
এ কারণে পরিবহনমন্ত্রী ডুডি পুরওয়াগান্ধি ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মহাপরিচালক লুকমান এফ. লাইসা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে যাত্রীদের নিরাপত্তাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং বায়ুমণ্ডল সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো বিমানবন্দর চালু করা হবে না। এমনকি ফ্লাইট চালুর আগে প্রতিটি বিমানের ইঞ্জিনে বিশেষ পরীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের কারণে জাকার্তা, বানতেন ও লামপুং প্রদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের দৃশ্যমানতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম কম্পাস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাতাসে ছাইয়ের তীব্র উপস্থিতি এবং এর কারণে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চোখে তীব্র জ্বালাপোড়া, শ্বাসকষ্ট ও ত্বকের অস্বস্তি দেখা দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট এলাকার স্কুলগুলোতে সশরীরে পাঠদান বন্ধ রেখে অনলাইনে ক্লাস পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ঘরের বাইরে বের হওয়া তো দূরের কথা, ঘরের ভেতরে থেকেও প্রতি কয়েক মিনিট পর পর উঠান বা আসবাবের ওপর জমে থাকা ছাই পরিষ্কার করতে হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা (BNPB) নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ঘরের ভেতরে থাকার, বাইরে বের হলে মাস্ক ও চোখের সুরক্ষায় গগলস বা চশমা ব্যবহারের কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। এছাড়া, চোখের জ্বালা ও শারীরিক ঝুঁকির কারণে অনেক স্থানীয় জেলে সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। পরিবেশগত এই সংকট মোকাবেলায় জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টি ঝরানোর জন্য ক্লাউড-সিডিংসহ বিভিন্ন আবহাওয়া পরিবর্তন কর্মসূচি গ্রহণের পরিকল্পনা করছে, যা দ্রুত আকাশ পরিষ্কার করতে সহায়তা করবে।
সুন্দা প্রণালিতে জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই আগ্নেয়গিরির আশপাশে নৌ চলাচলের ওপর কঠোর সতর্কতা জারি করা হয়েছে। স্থানীয় বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রণালি অতিক্রমকারী সব বাণিজ্যিক জাহাজ ও নৌযানকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে এবং আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের চারপাশে অন্তত ৩ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকাকে রেড জোন বা নিষিদ্ধ এলাকা ঘোষণা করেছে। তবে ভূতাত্ত্বিক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা নিশ্চিত করেছে যে, বর্তমান অগ্ন্যুৎপাতের কারণে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কোনো সুনামি সৃষ্টির আশঙ্কা নেই।
উল্লেখ্য, ১৮৮৩ সালে মূল ক্রাকাতাউ আগ্নেয়গিরির প্রলয়ঙ্করী বিস্ফোরণের পর সমুদ্রের তলদেশ থেকে এই আনাক ক্রাকাতাউ বা ক্রাকাতাউয়ের সন্তান-এর জন্ম হয়। এর আগেও ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে এই আগ্নেয়গিরির একটি অংশ ধসে সুমাত্রা ও জাভা উপকূলে ভয়াবহ সুনামির সৃষ্টি হয়েছিল, যাতে চারশতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।
ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের অন্যতম সক্রিয় ভূকম্পন ও আগ্নেয়গিরি বলয় বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় রিং অব ফায়ার-এর ওপর অবস্থিত হওয়ায় দেশটির কর্তৃপক্ষ বর্তমান পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে। জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং বিমান চলাচলের পরিবেশ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি সংস্থা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








