মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের সরকারি ভ্রমণ বিলে কঠোর নতুন নির্দেশনা
ফাইল ছবি
সরকারি কাজে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের দেশ-বিদেশে ভ্রমণের ব্যয় পরিশোধ এবং অগ্রিম অর্থ বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি আরোপ করেছে সরকার। এখন থেকে সরকারি সফরের বিল দাখিলের সময় নির্ধারিত প্রমাণক ও অনুমোদনের নথি সংযুক্ত করা, অগ্রিম অর্থ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমন্বয় করা, অনুমোদিত সময়ের অতিরিক্ত অবস্থানের ক্ষেত্রে নতুন করে অনুমোদন নেওয়া এবং মূল কপিসহ তিন সেট বিল জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হবে। এসব শর্ত পূরণ না হলে পরবর্তী ভ্রমণের জন্য নতুন অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হবে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মন্ত্রিসেবা শাখা গত ৩ সেপ্টেম্বর এ-সংক্রান্ত নতুন পরিপত্র জারি করেছে। উপসচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) শারমিন ইয়াসমিন স্বাক্ষরিত পরিপত্রে সরকারি অর্থে ভ্রমণের ক্ষেত্রে আর্থিক শৃঙ্খলা, নথির যথার্থতা এবং ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নোটিশ বোর্ডেও ৩ সেপ্টেম্বর পরিপত্রটি প্রকাশ করা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের সরকারি ভ্রমণের ব্যয় নির্বাহের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ থেকে অগ্রিম অর্থ বরাদ্দ অথবা সফর শেষে প্রকৃত ব্যয় পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ বিল দাখিল করতে হবে। অর্থাৎ সফরটি দেশীয় হোক কিংবা বৈদেশিক ব্যয়ের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের বিপরীতে অনুমোদন, যাতায়াত, অবস্থান ও পরিশোধের প্রমাণ দেখাতে হবে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত পরিপত্রের বিস্তারিত অনুযায়ী, এ প্রক্রিয়ায় মোট সাতটি বিষয়ে বিশেষ বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।
বৈদেশিক সফরের ক্ষেত্রে ভ্রমণ বিলের সঙ্গে সরকারপ্রধান কর্তৃক অনুমোদিত সারসংক্ষেপের অনুলিপি দিতে হবে। আর দেশের অভ্যন্তরে সরকারি সফরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ থেকে জারি করা মূল অফিস আদেশের কপি বিলের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। এর ফলে কোনো সফর অনুমোদিত কি না এবং সফরের উদ্দেশ্য ও সময়সীমা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নথি যাচাইয়ের সময় নিশ্চিত করা যাবে।
যাতায়াত ব্যয়ের ক্ষেত্রেও প্রমাণক দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিমান ভ্রমণের ক্ষেত্রে টিকিটের পাশাপাশি ব্যবহৃত বোর্ডিং পাস, অনুমোদিত ভ্রমণ বিবরণী ও ভ্রমণসূচি জমা দিতে হবে। অন্য কোনো যানবাহনে যাতায়াত করলে প্রকৃত ভাড়ার টিকিট বা সংশ্লিষ্ট প্রমাণক দিতে হবে। একইভাবে দেশে বা বিদেশে আবাসিক হোটেলে অবস্থান করলে প্রকৃতপক্ষে পরিশোধ করা অর্থের বিল বা গ্রহণযোগ্য প্রমাণক দাখিল করতে হবে। অর্থাৎ শুধু ব্যয়ের দাবি করলেই হবে না; দাবিকৃত ব্যয়ের বিপরীতে বাস্তব লেনদেনের নথিও উপস্থাপন করতে হবে।
বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রায় ব্যয়ের হিসাবেও আলাদা নজর দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যয় টাকায় দেখানোর পাশাপাশি যে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে তার বিনিময় হারসংক্রান্ত বিবরণী দিতে হবে। সফরের অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ভাউচার বা প্রমাণক বিলের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। এতে বিদেশি মুদ্রায় করা ব্যয়ের টাকার অঙ্ক নির্ধারণ এবং হিসাব যাচাইয়ের সুযোগ আরও স্পষ্ট হবে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গু মোকাবিলায় দেশব্যাপী ৩ মাসের বিশেষ অভিযান
নতুন নির্দেশনার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো অনুমোদিত সফরের সময়সীমা অতিক্রম করে অবস্থান। সরকারপ্রধানের অনুমোদিত সারসংক্ষেপে যে সময়ের জন্য বিদেশ সফরের অনুমোদন রয়েছে, তার বাইরে কেউ অবস্থান করলে সেই অতিরিক্ত সময়ের ব্যয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারি ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হবে না। অতিরিক্ত সময়ের জন্য সরকারি অর্থে ব্যয় বহন করতে হলে পুনরায় আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নিতে হবে। অনুমোদন ছাড়া অনুমোদিত মেয়াদের অতিরিক্ত অবস্থানের ব্যয় সরকারের ওপর চাপানো যাবে না।
অগ্রিম অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। পরিপত্রে অর্থ বিভাগের সর্বশেষ জারি করা নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। সরকারি সফরের জন্য অগ্রিম অর্থ গ্রহণ করলে সফর শেষে দেশে বা নিজ কর্মস্থলে ফেরার এক মাসের মধ্যে ওই অগ্রিম অর্থের সমন্বয় বিল দাখিল করতে হবে। আগের কোনো সফরের অগ্রিম অর্থ নির্ধারিত নিয়মে সমন্বয় না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা দপ্তরের অনুকূলে পরবর্তী সফরের জন্য নতুন অর্থ ছাড় বা বরাদ্দ দেওয়া হবে না। ফলে একটি সফরের অগ্রিম হিসাব নিষ্পত্তি না করে পরবর্তী সফরের অর্থ বরাদ্দ নেওয়ার সুযোগ থাকছে না।
সফরের আগে অগ্রিম অর্থ বরাদ্দের আবেদন করার সময় নিয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শেষ মুহূর্তে প্রশাসনিক জটিলতা বা অর্থ ছাড়ে বিলম্ব এড়াতে প্রয়োজনীয় সময় হাতে রেখে আবেদন ও বিল দাখিল করতে বলা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো সফরের আগে অর্থ ছাড়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের জন্য হিসাবরক্ষণ কর্তৃপক্ষকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া।
নথি ব্যবস্থাপনায়ও নতুন বাধ্যবাধকতা যুক্ত হয়েছে। প্রতিটি ভ্রমণ বিলের মূল কপিসহ মোট তিন সেট জমা দিতে হবে। বিলের সঙ্গে সংযুক্ত সব ফটোকপি যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সত্যায়িত হতে হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বলছে, নথি ব্যবস্থাপনা সহজ করা এবং পরবর্তী সময়ে হিসাব নিরীক্ষার কাজ নির্বিঘ্ন করার ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা সহায়ক হবে।
পরিপত্রের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে এটি সরকারের সব সিনিয়র সচিব ও সচিব, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের একান্ত সচিব (পিএস), মন্ত্রিপরিষদ সচিবের একান্ত সচিব, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাদের (ডিডিও) কাছে পাঠানো হয়েছে। সাধারণ তথ্য ও স্বচ্ছতার স্বার্থে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওয়েবসাইটের পরিপত্র অংশে এটি আপলোড করার ব্যবস্থাও নিতে বলা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নতুন নির্দেশনার ফলে সরকারি সফরের আগে অনুমোদন, সফরকালীন ব্যয় এবং সফর শেষে হিসাব নিষ্পত্তি তিনটি পর্যায়েই নথিভিত্তিক জবাবদিহি জোরদার হলো। বিশেষ করে বোর্ডিং পাস, টিকিট, হোটেল বিল, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, ভাউচার এবং অনুমোদিত সফরসূচির মতো প্রমাণক বাধ্যতামূলক করায় ভ্রমণ ব্যয়ের দাবির সঙ্গে বাস্তব ব্যয়ের সামঞ্জস্য যাচাইয়ের সুযোগ বাড়বে।
এটি একই সঙ্গে আগের ব্যবস্থার সংশোধিত ও হালনাগাদ সংস্করণ। নতুন পরিপত্র জারির মাধ্যমে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের গত বছরের ৪ মে জারি করা এ-সংক্রান্ত আগের পরিপত্রটি প্রতিস্থাপিত হয়েছে। ফলে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের সরকারি ভ্রমণের ব্যয় বরাদ্দ, অগ্রিম অর্থ গ্রহণ এবং সফর শেষে বিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এখন থেকে নতুন পরিপত্রের নির্দেশনাই অনুসরণ করতে হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








