নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৯:৩৩, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ-গোলাম আযমের ছবি পদদলিত করে বিক্ষোভ

ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ-গোলাম আযমের ছবি পদদলিত করে বিক্ষোভ

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে ঢাবি ক্যাম্পাস। 

এই ঘটনার জেরে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের একদল শিক্ষার্থী ডাকসুর প্রবেশপথ ও সংগ্রহশালার মেঝেতে জিন্নাহ ও জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের ছবি সাঁটিয়ে সেগুলো পদদলিত করে অভিনব ও কঠোর প্রতিবাদ জানান। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক ও শিক্ষাঙ্গনের আলোচনায় এটি অন্যতম প্রধান ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

সংস্কার কাজ শেষে গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালাটি পুনরায় সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। তবে এর ভেতরে থাকা প্রদর্শিত ছবিগুলো নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র অসন্তোষ ও সমালোচনা শুরু হয়। নতুন এই সংগ্রহশালায় বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো একক বা গৌরবোজ্জ্বল ছবি রাখা হয়নি, যা অত্যন্ত সচেতনভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। অথচ এর পরিবর্তে সেখানে স্থান পায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ঐতিহাসিক ছবি ও ডন পত্রিকার প্রতিবেদন।

সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত ছবিগুলোর মধ্যে একটি ছিল ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দেওয়া জিন্নাহর সেই ঐতিহাসিক ভাষণের সময়ের, যেখানে তিনি ঔদ্ধত্যপূর্ণভাবে ঘোষণা করেছিলেন কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। এ ছাড়া ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি দলগত ছবি এবং ছাত্রসংঘের বিতর্কিত নেতা আবদুল মালেকের ছবিও সেখানে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এসব তথ্য প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই রোববার রাত থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

এই ঘটনার প্রাথমিক প্রতিবাদ হিসেবে গত সোমবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার সরাসরি ডাকসু সংগ্রহশালায় প্রবেশ করে জিন্নাহর প্রদর্শিত তিনটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেন। এর পরপরই ছাত্র ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা সংগ্রহশালায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমকে ১৯৮১ সালে বায়তুল মোকাররমের সামনে জুতাপেটা করার একটি ঐতিহাসিক ছবি টানিয়ে দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দেন।

এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার দুপুরে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের সাধারণ শিক্ষার্থীরা আরও কঠোর পদক্ষেপ হিসেবে ডাকসুর মূল প্রবেশপথ এবং সংগ্রহশালার ভেতরের মেঝেতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও গোলাম আযমের ছবি আটকে তা প্রকাশ্যে পদদলিত করেন। 

আরও পড়ুন: ডাকসুতে জিন্নাহর ছবি বিতর্কের পর এবার গোলাম আযমের জুতাপেটার ছবি

প্রতিবাদী শিক্ষার্থীরা জানান, ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা নিজের দায়িত্বের কথা ভুলে সম্পূর্ণ মনগড়াভাবে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে সংগ্রহশালায় পাকিস্তানপন্থী নেতার ছবি প্রদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জিন্নাহর প্রতি ইতিবাচক পোস্ট ও ছবি সরানোর বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করায় শিক্ষার্থীদের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।

কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী শিব্বির আহমেদ স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরার সুনির্দিষ্ট নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে নির্বাচিত হয়েও একজন দায়িত্বশীল সম্পাদক কীভাবে এমন পাকিস্তানপন্থী চাটুকারিতায় লিপ্ত হন, তা বোধগম্য নয়। বিগত দিনে ফ্যাসিবাদী বা একদলীয় রাজনীতির নানা প্রতীক হটিয়ে দেওয়ার পর এখন নতুন করে জিন্নাহ ও গোলাম আযমের মতো স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির ছবি পুনর্বাসনের যেকোনো অপচেষ্টা ছাত্রসমাজ সম্মিলিতভাবে রুখে দেবে। 

ইংলিশ ফর স্পিকারস অব আদারস ল্যাংগুয়েজ বিভাগের শিক্ষার্থী আশ শামস ও ওয়াসিম উদ্দিন রাহাতসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উল্লেখ করেন যে, ৩০ লাখ শহীদের রক্ত এবং ভাষা আন্দোলনের শহীদ সালাম-বরকতের পবিত্র ভূমিতে কোনো স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির পুনর্বাসন বাংলার মাটি সহ্য করবে না।

শিক্ষার্থীদের এই লাগাতার আন্দোলন ও প্রতিবাদের মুখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তৎপর হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিতর্কিত ছবি টানানোর পুরো বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করতে গত সোমবারই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এদিকে সোমবারের ভাঙচুর ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সংগঠনের একটি অংশ ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক ডাকসু সংগ্রহশালা পরিদর্শন করেছে। 

পরিদর্শন শেষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সংগঠনের সভাপতি ও আরবি বিভাগের শিক্ষক যুবায়ের মুহাম্মদ এহসানুল হক বলেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা সকলেরই আছে এবং কোনো অনিয়ম বা অন্যায় প্রমাণিত হলে প্রশাসন তার আইনানুগ বিচার করবে; কিন্তু মব বা সংঘবদ্ধভাবে ডাকসু সংগ্রহশালায় ভাঙচুর চালানো কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।

সবমিলিয়ে, ডাকসু সংগ্রহশালায় ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে ঢাবি ক্যাম্পাসে যে আদর্শিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়েছে, তা এখন প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত এবং শিক্ষার্থীদের কঠোর অবস্থানের মধ্য দিয়ে এক জটিল মোড় নিয়েছে। 
বাংলাদেশপন্থি ও স্বাধীনতাকামী শিক্ষার্থীরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, ক্যাম্পাসে যেকোনো ধরনের পাকিস্তানপন্থি বা স্বাধীনতাবিরোধী ষড়যন্ত্রের ঠাঁই হবে না এবং তাদের এই প্রতিরোধ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়