ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে প্রতিবাদ
আবু তৈয়ব হাবিলদার। ছবি: সংগৃহীত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সদ্য সংস্কার করা সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি প্রদর্শনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল, তা এক দিনের ব্যবধানে আরও তীব্র হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সংগ্রহশালায় ঢুকে জিন্নাহর প্রদর্শিত তিনটি ছবির ফ্রেম ভেঙে ছবি ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে একটি ছবির ফ্রেম ভেঙে ছবি বের করে ছিঁড়ে ফেলেন তিনি। পরে আরও দুটি ছবি ফ্লোরে আছড়ে ফেলে ফ্রেম থেকে বের করে নষ্ট করেন। ঘটনাটি ঘিরে ডাকসুর সংগ্রহশালার ইতিহাস উপস্থাপনের ধরন, জিন্নাহর ছবি সেখানে রাখার যৌক্তিকতা, ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে কীভাবে প্রদর্শন করা উচিত এবং কোনো মতের বিরোধিতা করতে গিয়ে ঐতিহাসিক নিদর্শন ভাঙচুর করা কতটা গ্রহণযোগ্য এসব প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।
ঘটনার সময় আবু তৈয়ব হাবিলদার তার দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। সেখানে জিন্নাহর ছবি দেখে তিনি ক্ষুব্ধ হন এবং একপর্যায়ে ফ্রেম ভেঙে ছবি ছিঁড়ে ফেলেন।
পরে সাংবাদিকদের কাছে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, যা মন চায় তা করতে দেওয়া হবে না। এই খলনায়কের ছবি ডাকসুতে থাকবে না।
তার ভাষ্য, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে জিন্নাহর রাজনৈতিক ভূমিকার যে সম্পর্ক, তা বিবেচনায় নিয়ে ডাকসুর মতো প্রতিষ্ঠানে তাঁর ছবি কীভাবে এবং কোন ব্যাখ্যায় প্রদর্শিত হচ্ছে, তার জবাব দিতে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ডাকসুর নির্বাচনী ইশতেহারে জিন্নাহকে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠার কথা ছিল কি না।
একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন্নাহসহ বিতর্কিত ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। আবু তৈয়ব আরও বলেন, আমরা একাত্তর, ভাষা সংগ্রাম ভুলি নাই।
তার বক্তব্যের আরেক অংশে তিনি দাবি করেন, জিন্নাহর ১৯৪৮ সালের ভাষণের মধ্য দিয়েই তৎকালীন পূর্ববাংলায় ভাষার প্রশ্নে যে রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার সংগ্রামের পথকে প্রভাবিত করে।
আবু তৈয়ব হাবিলদারের পরিচয়ও এ ঘটনার আলোচনায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্রভাবে সহসভাপতি (ভিপি) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে প্রবীণ প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় ছিলেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২০২৫ সালের নির্বাচনী প্রতিবেদনে তার বয়স ৪৫ বছর এবং তাকে উর্দু বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ডাকসুর প্রকাশিত নির্বাচনী ফলাফলেও মুহাম্মাদ আবু তৈয়ব (হাবিলদার) নামটি সহসভাপতি পদপ্রার্থীদের তালিকায় রয়েছে; প্রকাশিত ফল অনুযায়ী তিনি ১০ ভোট পেয়েছিলেন।
আবু তৈয়বের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে পুনরায় নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। অতীতে ১/১১-এর সময়, কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় থাকার দাবিও তিনি করেছেন। ২০২৫ সালের নির্বাচনের আগে দেওয়া তাঁর বক্তব্যে দীর্ঘ সময় ছাত্ররাজনীতির বিভিন্ন আন্দোলনে সম্পৃক্ততা এবং ২০০৯ সালে ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার হয়ে শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হওয়ার কথাও তিনি জানিয়েছিলেন।
আবু তৈয়বের প্রতিবাদের মূল কেন্দ্র ছিল ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি সংযোজন। এর এক দিন আগে, রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর), দীর্ঘ সংস্কার শেষে সংগ্রহশালাটি নতুনভাবে উদ্বোধন করা হয়। ডাকসুর উদ্যোগে সংস্কার করা এই সংগ্রহশালাকে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং ডাকসুর ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ডের স্মৃতি সংরক্ষণের স্থান হিসেবে গড়ে তোলার কথা জানানো হয়েছিল। উদ্বোধন করেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম। সংস্কারকাজের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা। ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদসহ অন্য নেতারাও উদ্বোধনী আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন: সাত বছর পর ডাকসুর জিএস পদ ফিরে পেলেন রাশেদ খাঁন
ডাকসুর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, সাবেক ভিপি ও জিএস, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে থাকা পুরোনো ছবি, নথি, প্রকাশনা, পোস্টার, স্মারক ও অন্যান্য ঐতিহাসিক উপকরণ পর্যায়ক্রমে সংগ্রহশালায় যুক্ত করা হবে।
সংস্কারের পর সংগ্রহশালায় বিভিন্ন সময়ের ইতিহাস ক্রমানুসারে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ জানিয়েছিলেন, দীর্ঘদিনের অবহেলায় প্রায় ময়লার স্তূপে পরিণত হওয়া সংগ্রহশালাটিকে সংস্কার করে সেখানে প্রাচীন ইতিহাস থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের বিভিন্ন রাজনৈতিক পর্যায় এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে। কিছু ভিপির ছবি ও অন্যান্য তথ্যের ঘাটতি থাকায় উদ্বোধনের পর আরও কিছু সংশোধনের জন্য সময়ও নির্ধারণ করা হয়েছিল। ডাকসুর পক্ষ থেকে সংগ্রহশালাটিকে ধীরে ধীরে একটি সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক আর্কাইভে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়।
এই সংস্কারের পরই সংগ্রহশালায় জিন্নাহর তিনটি ছবি যুক্ত করার বিষয়টি সামনে আসে। প্রদর্শিত ছবিগুলোর একটি ছিল ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া জিন্নাহর ভাষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। ওই ভাষণে তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নেন। দ্বিতীয় ছবিটি ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি দলগত ছবি, যেখানে জিন্নাহ ছিলেন। ওই সম্মেলনেই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে পৃথক রাষ্ট্রের দাবিসংবলিত লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হয়। তৃতীয়টি ছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচনসংক্রান্ত জিন্নাহর ছবি-সংবলিত পাকিস্তানের ডন পত্রিকার একটি প্রতিবেদন বা পেপার কাটিং। ফলে ডাকসু কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনায় জিন্নাহর উপস্থিতি কেবল ব্যক্তির ছবি প্রদর্শন নয়, বরং উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সময়কে দলিল হিসেবে তুলে ধরার অংশ ছিল বলে তাদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়।
তবে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি উদ্বোধনের আগেই রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে বিতর্ক তৈরি করে। বিশেষ করে ১৯৪৮ সালের ভাষানীতির প্রশ্নে জিন্নাহর ভূমিকার কারণে তার ছবি ডাকসু সংগ্রহশালায় কী উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ইতিহাসের নথি অনুযায়ী, ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার জনসভায় জিন্নাহ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নেন এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে দেওয়া সমাবর্তন ভাষণেও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তার ওই অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।
বাঙলাপিডিয়ার ভাষা আন্দোলনবিষয়ক বিবরণেও বলা হয়েছে, ১৯৪৮ সালে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির বিপরীতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার অবস্থান নেয় এবং জিন্নাহর ঢাকা সফরের সময় তিনি উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার দাবি জোরালো হয়। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলা ভাষাকে পরিষদের ভাষাগুলোর অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন, যা প্রত্যাখ্যাত হয়। এরপর ১১ মার্চ পূর্ববাংলায় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ধর্মঘট হয় এবং একাধিক ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতা গ্রেপ্তার হন। মার্চে জিন্নাহ ঢাকায় এসে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করলে ভাষার প্রশ্নে বিরোধ আরও তীব্র হয়। পরবর্তী কয়েক বছরে সেই আন্দোলন বিস্তৃত হয়ে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে চূড়ান্ত রূপ নেয়। ফলে জিন্নাহর ছবি ডাকসুর সংগ্রহশালায় রাখাকে কেউ কেউ ইতিহাসের একটি অধ্যায়কে দলিল হিসেবে উপস্থাপন হিসেবে দেখলেও, অন্য পক্ষ এটিকে ভাষা আন্দোলনের ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক প্রতীকী অবস্থান হিসেবে দেখছে।
এই বিতর্কের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল জিন্নাহর ছবি সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানায়। সংগঠনটির নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ডাকসুর সভাপতি অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ছবি অপসারণের জন্য ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেওয়ার কথা জানান।
ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গভীর সম্পর্ক থাকার পরও সংগ্রহশালায় বিতর্কিত ব্যক্তির ছবি প্রদর্শন করা হয়েছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ছবি সরানো না হলে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয় ও ডাকসু সংগ্রহশালায় কর্মসূচি দেওয়ার কথা জানিয়েছিল।
একই বিষয়ে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের একাংশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ এবং বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের নেতারাও আপত্তি জানান। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, ১৯৪৮ সালে জিন্নাহর বক্তব্যের প্রতিবাদ থেকেই ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছিল; সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন ভাষা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহ্যের প্রতি অবমাননাকর।
তার বক্তব্যে ডাকসুকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আদর্শ প্রচারের জায়গা না বানিয়ে শিক্ষার্থীদের ইতিহাস ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর আহ্বান জানানো হয়। ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের আহ্বায়ক সৈকত আরিফও সংগ্রহশালায় ইতিহাস উপস্থাপনের ধরন নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বলেন, জিন্নাহকে নায়ক হিসেবে উপস্থাপনের মতো কোনো আয়োজন ইতিহাসের বিকৃতি ঘটাতে পারে।
অন্যদিকে, জিন্নাহকে ঘিরে ডাকসুর বর্তমান নেতৃত্বের অবস্থান নিয়েও এর আগে আলোচনা হয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতেমা তাসনিম জুমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জিন্নাহকে স্মরণ করে দেওয়া একটি পোস্ট নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। ওই পোস্টকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা তার রাজনৈতিক অবস্থান এবং ডাকসুর দায়িত্বের সঙ্গে সেই অবস্থানের সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। এর পর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি সংযোজন এবং সোমবার তা ভাঙচুরের ঘটনা একই বিতর্ককে আরও প্রকাশ্য সংঘাতে নিয়ে আসে।
ছবি ছেঁড়ার ঘটনার পর ডাকসুর পক্ষ থেকেও প্রতিক্রিয়া এসেছে। ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ঘটনাটিকে ডাকসু সংগ্রহশালায় হামলা হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বলে জানিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের বক্তব্য অনুযায়ী, সংগ্রহশালায় ছবি ভাঙচুরের ঘটনায় কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ডাকসু ভবনে বিতর্কিত ছবি লাগানোর কারণ, উদ্দেশ্য, ছবি অপসারণ এবং ভাঙচুর—সংশ্লিষ্ট সব বিষয়কে বৃহত্তর আইনগত প্রক্রিয়ার আওতায় আনার কথাও তিনি জানান।
তার বক্তব্যে আরও আসে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন নিজেদের সক্ষমতার ভিত্তিতে ইচ্ছামতো কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে না; বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে নির্ধারিত নিয়ম ও অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন। প্রক্টর ডাকসুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করলেও প্রশাসনিক কাঠামোর বিকল্প হিসেবে ডাকসুর কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন।
ঘটনাটির আরেকটি দিক হলো, সংগ্রহশালা সংস্কারের উদ্দেশ্য নিয়ে ডাকসু কর্তৃপক্ষের যে বক্তব্য ছিল, তার সঙ্গে বর্তমান বিতর্কের একটি মৌলিক পার্থক্য তৈরি হয়েছে। সংস্কারের সময় ডাকসু জানিয়েছিল, পুরোনো নথি, ছবি, পোস্টার, প্রকাশনা ও স্মারক সংগ্রহ করে দেশের ইতিহাস এবং ডাকসুর ভূমিকা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হবে। এমনকি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সাবেক নেতাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ভুলত্রুটি সংশোধনের সুযোগ রাখার কথাও বলা হয়েছিল। ফলে কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তির ছবি সেখানে থাকলেই তাকে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে কি না, নাকি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করার জন্যই উপাদানটি রাখা হয়েছে এই প্রশ্নটি এখন বিতর্কের কেন্দ্রে।
তবে ছবির প্রদর্শনের উদ্দেশ্য নিয়ে যে বিতর্কই থাকুক, সেটির প্রতিবাদে সংগ্রহশালার প্রদর্শনী ভাঙচুর নতুন আরেকটি প্রশ্ন তৈরি করেছে। ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে মতবিরোধের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও একাডেমিক বিতর্কের জায়গা যেমন রয়েছে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ ও ঐতিহাসিক উপকরণ সংরক্ষণের দায়ও রয়েছে। একটি সংগ্রহশালার মূল উদ্দেশ্যই হলো সময়ের বিভিন্ন পর্যায়ের দলিল ও স্মৃতি সংরক্ষণ করা; সেই উপকরণ নিয়ে আপত্তি থাকলে তার ব্যাখ্যা, সংশোধন বা অপসারণের প্রাতিষ্ঠানিক পথ কতটা কার্যকর এই ঘটনাটি সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন এবং তা ছিঁড়ে ফেলার ঘটনায় পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা চলছে। এক পক্ষ বলছে, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিকে ডাকসু সংগ্রহশালায় প্রদর্শন করা উচিত নয়। অন্য পক্ষের অবস্থান হলো, ইতিহাসের বিতর্কিত চরিত্র ও ঘটনাগুলোও দলিল হিসেবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে যথাযথ ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরা জরুরি। এই বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংগ্রহশালায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও ভাষা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের ছবি বা দলিল কীভাবে এবং কতটা গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেই প্রশ্নও।
সব মিলিয়ে, এক দিনের ব্যবধানে ডাকসু সংগ্রহশালা পরিণত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় পরিচয় এবং ইতিহাস উপস্থাপনের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। একদিকে সংস্কারের পর একটি আধুনিক ও ধারাবাহিক ঐতিহাসিক আর্কাইভ গড়ে তোলার উদ্যোগ, অন্যদিকে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন নিয়ে ছাত্রসংগঠনগুলোর আপত্তি এবং সেই আপত্তির মধ্যে ছবি ভাঙচুর তিনটি ঘটনা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। এখন মূল প্রশ্ন শুধু জিন্নাহর ছবি থাকবে কি না, তা নয়; বরং ডাকসু সংগ্রহশালা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ছাত্রআন্দোলনের ইতিহাস কী দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করবে, ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কী ধরনের নিরপেক্ষ ও প্রামাণ্য কাঠামো অনুসরণ করবে এবং বিতর্কের সমাধান কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে করা হবে সেদিকেই তাকিয়ে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট মহল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আইনগত পরামর্শ এবং ডাকসুর আনুষ্ঠানিক অবস্থান সামনে এলে এ বিতর্কের পরবর্তী গতিপথ আরও স্পষ্ট হতে পারে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








