শিক্ষা-প্রযুক্তিতে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা চান রাষ্ট্রপতি
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের শিক্ষা, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সঙ্গে দুই দেশের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ করতে শিক্ষা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জলবায়ু ও আবহাওয়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার পরিধি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বঙ্গভবনে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে এ আহ্বান জানান মির্জা ফখরুল।
সাক্ষাৎ শেষে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম এ বিষয়ে সাংবাদিকদের অবহিত করেন। বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা, বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও মানবসম্পদ উন্নয়ন, যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার এবং জলবায়ু তথ্য বিনিময়ের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
সাক্ষাৎকালে সারাহ কুক রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় চার্লসের পক্ষ থেকে একটি অভিনন্দনপত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে হস্তান্তর করেন। এ জন্য রাজা তৃতীয় চার্লসের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি। একই সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের মাধ্যমে ব্রিটিশ রাজার প্রতি তার শুভেচ্ছা পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের পরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার। দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
তার মতে, প্রবাসী বাংলাদেশিরা দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করছেন। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি কমনওয়েলথের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবেও বাংলাদেশ অভিন্ন স্বার্থ ও উন্নয়নসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বৈঠকে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের উন্নয়ন ও মানবসম্পদ তৈরিতে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও সম্প্রসারণ, কমনওয়েলথের শিক্ষাবৃত্তির সংখ্যা বাড়ানো এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্রিটিশ সহায়তা কামনা করেন তিনি। একই সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রপতি।
শিক্ষা ও প্রযুক্তির পাশাপাশি দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করেন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন সুযোগ তৈরি এবং বিদ্যমান সহযোগিতাকে আরও কার্যকর করার মাধ্যমে বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক আগামী দিনে আরও শক্তিশালী হবে।
আরও পড়ুন: নভেম্বরের মাঝামাঝিতে ইউপি নির্বাচন শুরু করছে ইসি
বৈঠকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়।
রাষ্ট্রপতি বলেন, একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আবার গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে এসেছে। এই ধারাকে আরও সুসংহত করতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও জনপ্রতিনিধিদের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতির গণতন্ত্র চর্চায় যুক্তরাজ্যের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি দুই দেশের সংসদ সদস্যদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, পারস্পরিক সফর এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক স্বার্থের দিক থেকেও বৈঠকের আলোচনা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক জানান, তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের প্রায় ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ পণ্য স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পরও আরও তিন বছর যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত অবাধ প্রবেশাধিকার সুবিধা পাবে। রাষ্ট্রপতি এ সুবিধাকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক। ফলে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখা এবং রপ্তানি বাজারে সুবিধা বজায় রাখা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের মেয়াদ বাড়ার সুযোগকে নতুন বিনিয়োগ, রপ্তানি সম্প্রসারণ ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ।
এ ছাড়া বৈঠকে জলবায়ু ও আবহাওয়া-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের একটি নতুন উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়। ব্রিটিশ হাইকমিশনার বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ডিজিটাল ক্লাইমেট ডাটা বিনিময়ের উদ্যোগ সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন। দুই দেশের মধ্যে আবহাওয়া ও জলবায়ু-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময় হলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস আরও নির্ভুল করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস কৃষি উৎপাদন পরিকল্পনা, ফসল ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রাষ্ট্রপতি এ উদ্যোগে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আবহাওয়া ও জলবায়ু-সংক্রান্ত তথ্যের কার্যকর ব্যবহার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে দুই দেশের তথ্য ও জ্ঞান বিনিময় ভবিষ্যতে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে বলেও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
সার্বিকভাবে বৈঠকে বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য সম্পর্ককে শুধু ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জলবায়ু সহযোগিতার মতো বহুমাত্রিক ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত করার প্রত্যাশা উঠে আসে।
রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করেন, পারস্পরিক স্বার্থ ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্রগুলো কাজে লাগানো গেলে আগামী দিনে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী, কার্যকর ও ফলপ্রসূ হবে।
সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব, রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব, ব্রিটিশ ডেপুটি হাইকমিশনার ও উন্নয়ন পরিচালক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








