মক্কায় ড্রোন হামলার অভিযোগে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ
ফাইল ছবি
সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কা আল-মুকাররমাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার অভিযোগের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে মক্কা আল-মুকাররমা ও সৌদি আরবের অন্যান্য পবিত্র স্থানের মর্যাদা, পবিত্রতা ও নিরাপত্তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পুনর্ব্যক্ত করেছে ঢাকা।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের এই অবস্থান জানানো হয়। এতে পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের সরকার ও জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, মক্কা আল-মুকাররমাসহ সৌদি আরবের পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা ও পবিত্রতা সব সময় পূর্ণাঙ্গভাবে সম্মান ও সুরক্ষিত রাখতে হবে। পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা যেকোনো পরিস্থিতিতে নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি উল্লেখ করে এসব স্থান রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও দেশটির জনগণের পাশে থাকার কথাও জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের এই নিন্দার নেপথ্যে রয়েছে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মক্কার দক্ষিণে একটি ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংস করার সৌদি আরবের দাবি।
সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেনবিষয়ক সামরিক জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানান, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটের দিকে সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী একটি ড্রোন শনাক্ত করে। ড্রোনটি পবিত্র নগরীর জন্য নির্ধারিত নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়। ড্রোনটির ধ্বংসাবশেষ মক্কার দক্ষিণ দিকে পড়েছে বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, ড্রোনটি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা উৎক্ষেপণ করেছিল এবং এর লক্ষ্য ছিল মক্কা।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, দুই পবিত্র মসজিদ ও হজযাত্রীদের নিরাপত্তা সৌদি আরবের জন্য রেড লাইন। মক্কায় হজ ও ওমরাহ পালন করতে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মুসল্লি সমবেত হওয়ায় শহরটির আকাশসীমা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচিত হয়।
সৌদি সামরিক জোটের তথ্য অনুযায়ী, মক্কাকে লক্ষ্য করে এ ধরনের ঘটনা প্রায় এক দশকের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ঘটল। এর আগে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে মক্কার দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল। সেই ক্ষেপণাস্ত্রও মক্কার আকাশসীমায় পৌঁছানোর আগেই প্রতিহত করা হয়। সাম্প্রতিক ড্রোন ঘটনাকে সৌদি কর্তৃপক্ষ সেই ঘটনার পর মক্কাকে লক্ষ্য করে দ্বিতীয় প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তবে মক্কাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে হুতিরা।
গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এবং অন্য হুতি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তাদের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ছিল সৌদি আরবের সামরিক স্থাপনা ও তেল অবকাঠামো; পবিত্র স্থানগুলো তাদের লক্ষ্য নয়। হুতি পক্ষ সৌদি দাবিকে মিথ্যা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে ড্রোনটির প্রকৃত উৎক্ষেপণস্থল ও লক্ষ্য নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি এবং হুতিদের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে।
মক্কার ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতিদের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সৌদি ভূখণ্ডের বিভিন্ন শহর ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের ধারাবাহিক হামলার মধ্যে সৌদি আরবের খামিস মুশাইত, আবহা ও তাইফ এলাকায় হামলার ঘটনায় ১৩ জন বেসামরিক ব্যক্তি আহত হন এবং কয়েকটি বাড়ি ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এর আগে সৌদি সিভিল ডিফেন্স জেদ্দা, আবহা, জাজান, আলউলা, তাইফ ও ইয়ানবুসহ কয়েকটি এলাকায় নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছিল। মঙ্গলবার এসব এলাকার কয়েকটিতে তাৎক্ষণিক হুমকি কেটে যাওয়ার কথা জানানো হলেও সৌদি ভূখণ্ডে হুথিদের হামলার ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের রেড সি উপকূল ও বাব আল-মান্দাবের কৌশলগত এলাকাতেও সংঘাত তীব্র হয়েছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপরও প্রভাব ফেলছে।
মক্কাকে ঘিরে সর্বশেষ এই ঘটনা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। সৌদি আরবের দাবি প্রকাশের পর মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংগঠন পবিত্র নগরীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পাকিস্তান, তুরস্ক ও ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা ওআইসিসহ বিভিন্ন পক্ষ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
মক্কা ইসলামের পবিত্রতম নগরী এবং কাবা শরিফ ও মসজিদুল হারামের অবস্থান এই নগরীতেই। প্রতি বছর হজ ও সারা বছর ওমরাহ পালনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি মক্কায় যান। ফলে নগরীটির নিরাপত্তা নিয়ে যেকোনো সামরিক তৎপরতা ধর্মীয় ও মানবিক দুই দিক থেকেই ব্যাপক সংবেদনশীলতা তৈরি করে। সৌদি কর্তৃপক্ষও মক্কা ও মদিনার দুই পবিত্র মসজিদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে অবশ্য ড্রোনটি হুথিদেরই ছিল এমন কোনো স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি; বরং মক্কাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার খবর বা সৌদি পক্ষের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই নিন্দা জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনেও সৌদি কর্তৃপক্ষের অভিযোগের পাশাপাশি হুথিদের অস্বীকৃতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ঘটনার দায় কার, তা নিয়ে দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যই এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে রয়েছে।
এর আগে চলমান সৌদি-হুথি উত্তেজনার মধ্যেও বাংলাদেশ সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলার নিন্দা জানিয়েছিল। এবার মক্কার মতো ইসলামের পবিত্রতম নগরীর নিরাপত্তা ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় ঢাকা পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান হলো, পবিত্র স্থানগুলোকে যেকোনো ধরনের হামলা, হুমকি ও নিরাপত্তাঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখা এবং এসব স্থানের পবিত্রতা সম্পূর্ণভাবে সম্মান করা জরুরি।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








