৪২ ফুটেও সাড়া মিলছে না শিশু সাজিদের
ছবি: সংগৃহীত
রাজশাহীর তানোর উপজেলার কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামে পরিত্যক্ত একটি গভীর নলকূপের গর্তে পড়ে যাওয়া দুই বছরের শিশু সাজিদকে উদ্ধারে বুধবার দুপুর থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়েও সফল হওয়া যায়নি।
বুধবার (১০ ডিসেম্বর) দুপুর সওয়া ১টার দিকে মাঠে খেলতে গিয়ে মাত্র ৮ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের সেই অন্ধকার গর্তে পড়ে যায় শিশুটি। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে স্থানীয়রা প্রথমে উদ্ধারচেষ্টা চালায়, কিন্তু গর্তের ভেতর থেকে কিছুক্ষণ সাড়া পেলেও শিশুটিকে টেনে ওঠানো সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিসে জানানো হলে দ্রুত পাঁচটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে।
ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তারা বুঝতে পারে যে শিশুটিকে টেনে তুলতে হলে গর্তের পাশ থেকে বড় আকারে খনন করতে হবে, যার জন্য শক্তিশালী এক্সকেভেটর প্রয়োজন। কিন্তু পুরো তানোর উপজেলায় কোনো বড় এক্সকেভেটর পাওয়া না যাওয়ায় মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। অবশেষে রাত ৮টার দিকে মোহনপুর উপজেলা থেকে দুটি ছোট এক্সকেভেটর এনে খনন শুরু করা হয়।
রাতভর খননের পর বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) বেলা ১১টা থেকে দুপুর পর্যন্ত উদ্ধারকারীরা জানায়, তারা ৪০ থেকে ৪২ ফুট গভীর পর্যন্ত গর্তের পাশ থেকে খুঁড়ে সুড়ঙ্গ তৈরি করেছে, কিন্তু শিশুটির অবস্থান পাওয়া যায়নি। ক্যামেরা নামিয়েও শিশুকে শনাক্ত করা যায়নি; ক্যামেরাটি ৩৫ ফুটে গিয়ে আটকে যায়।
ফায়ার সার্ভিসের অনুমান, শিশুটি এরও গভীরে নেমে গেছে, যদিও গর্তটির প্রকৃত গভীরতা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, পরিত্যক্ত নলকূপটির গভীরতা ৮০ থেকে ৮৫ ফুট।
অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক দিদারুল আলম জানিয়েছেন, গর্তটির গভীরতা ১৫০ থেকে ২০০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে এবং শিশুটি এর যেকোনো জায়গায় আটকে থাকতে পারে। উদ্ধার অভিযান যত এগিয়েছে, পরিস্থিতি তত জটিল হয়েছে।
আরও পড়ুন: রাজশাহীতে নলকূপে আটকে থাকা শিশু ১৮ ঘণ্টা পরেও উদ্ধার হয়নি
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, বিভিন্ন পর্যায়ে ৪০ ফুটেরও বেশি গভীরতা পর্যন্ত অনুসন্ধান চালানো হলেও কোনো জীবনের চিহ্ন মেলেনি। গর্তে অক্সিজেন সরবরাহ অব্যাহত রাখা হচ্ছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় উদ্ধারকাজ চললেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগ বাড়ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার পরপরই শিশুটির ‘মা, মা’ শব্দ শোনা গেলেও সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই শব্দ মিলিয়ে যায়।
স্থানীয়দের ধারণা, এলাকার পানির স্তর ১৩০ থেকে ১৪০ ফুটের নিচে হওয়ায় শিশুটি হয়তো আরও তলদেশে নেমে গেছে। এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপ বসানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
শিশুটির পরিবারের বর্ণনা অনুযায়ী, সাজিদের মা রুনা খাতুন দুপুরে দুই সন্তানকে নিয়ে বাড়ির পাশের মাঠে হাঁটছিলেন। মেজো ছেলে সাজিদ তার হাত ধরে ছিল এবং তার আরেক শিশু কোলে ছিল। হাঁটার সময় হঠাৎ সাজিদ ‘মা, মা’ বলে চিৎকার করলে তিনি পেছনে তাকিয়ে দেখেন ছেলে নেই। খড় দিয়ে ঢেকে রাখা জায়গার নিচে গর্ত আছে তা তিনি বুঝতেই পারেননি। গর্তের ভেতর থেকে আরও কয়েক মুহূর্ত ছেলের ডাক শুনতে পেলেও দ্রুতই শব্দ থেমে যায়। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঢাকায় কর্মরত শিশুর বাবা রাকিব রাতেই তানোরে পৌঁছান এবং অসহায় অবস্থায় বলেন তিনি এখন কেবল আল্লাহর ওপর নির্ভর করছেন।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গর্তটি বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) পরীক্ষামূলক গভীর নলকূপের জন্য খোঁড়া হয়েছিল। কছির উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি তার জমিতে পানির স্তর পরীক্ষা করতে গর্তটি খনন করেন এবং পরে ভরাটও করেন। কিন্তু বর্ষায় মাটি নেমে গিয়ে গর্তটি আবার খুলে যায়।
পাম্পের মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ, তারা পরিত্যক্ত নলকূপটির মুখ খোলা অবস্থায় রেখে দীর্ঘদিন কোনো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেননি, যা এ দুর্ঘটনার কারণ হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত উদ্ধারকাজ শেষ হয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন তানোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীনুজ্জামান।
তিনি জানান, ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটগুলো অব্যাহতভাবে কাজ করছে এবং প্রয়োজনে বিকল্প পদ্ধতি নেওয়া হবে। ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসাসামগ্রী এবং জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। হাজারো মানুষের ভিড় এবং পরিবারের কান্নায় পুরো এলাকা ভারী হয়ে উঠেছে। তবে এখন পর্যন্ত শিশুটির অবস্থান নির্ধারণ করা না যাওয়ায় উদ্ধারকারীরা সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়াচ্ছেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








