News Bangladesh

|| নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৩:১২, ১৩ এপ্রিল ২০১৫
আপডেট: ০৩:৩৭, ১৯ জানুয়ারি ২০২০

যা বলার, বলতে না চাইলে জিব কাটো লজ্জায়!

যা বলার, বলতে না চাইলে জিব কাটো লজ্জায়!

বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ে না গুন্টার গ্রাসের। তিনিও বিতর্কের ভয়ে চুপ থাকার মতো লেখকও নন। ফলে, আমরা সদ্য প্রয়াত এই লেখকের কাছেই পেতে থাকি অনুচ্চারিত অনেক কিছু। যেমন, কলকাতা সফর শেষে গ্রাস শহরটির আবর্জনা, দারিদ্র্যের ছাপ, হিন্দু দেবী কালী, তার লম্বা জিহ্বা – এসবের সমন্বয়ে নিজের কল্পনার জগত নিয়ে ‘সুঙে সাইগেন’ নামে একটি বই লেখেন। যার বাংলা ‘জিব কাটো লজ্জায়'। বইটি কলকাতায় বহু বিতর্কের জন্ম দিয়ে গেছে এবং এখনও বিতর্কিত।

গুন্টার গ্রাসের একটি কবিতা বিশ্ব রাজনীতির মাঠ গরম করে তোলে। বিশ্ব রাজনীতির বিবাদমান দুই পক্ষের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হয় কবিতাটি নিয়ে। এমনকি, উক্ত কবিতার জন্য গুন্টার গ্রাসের বিরুদ্ধে ইহুদি বিদ্বেষের অভিযোগ আনা হলে, তিনি মুখ খুলতে বাধ্য হন।

দৈনিক স্যুডডয়চে সাইটুং এ ‘অবশ্যই যা বলতে হবে’ শীর্ষক কবিতাটি প্রকাশের পরপরই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। ইরান ও ইসরায়েল প্রসঙ্গে লেখা হয়েছিল কবিতাটি। ইরানের বিতর্কিত পরমাণু কর্মসূচির কথা যেমন রয়েছে ওই কবিতায়, তেমনি দেশটিতে ইসরায়েলের আগাম হামলা বিষয়ক চিন্তাও ফুটিয়ে তুলেছেন রাজনীতি সচেতন সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাস। ইসরায়েলের পরমাণু হামলা চালিয়ে ইরানকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় ওই কবিতায়। পাশাপাশি জার্মানি ইসরায়েলের কাছে সাবমেরিন বিক্রি করার ঘটনারও তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। ‘অবশ্যই যা বলতে হবে’ বা ‘হোয়াট মাস্ট বি সেইড’ কবিতায় গুন্টার গ্রাস বিশ্বশান্তির জন্য ইসরায়েলকে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন।

কবিতাটি প্রকাশের পরপরই জার্মানিতেই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন গুন্টার গ্রাস। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, একই পাল্লায় ইসরায়েল ও ইরানকে পরিমাপ করে গ্রাস এক লজ্জাজনক ঘটনার জন্ম দিয়েছেন। নেতানিয়াহুর মতে, ইসরায়েল নয়, ইরানই বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বলেছিলেন, গুন্টার গ্রাসই নাৎসি সংগঠন ওয়েপেন এসএসের সদস্য থাকার কথা ছয় দশক ধরে গোপন রেখেছিলেন।

অন্যদিকে জার্মানির লেখক, শিল্পী, রাজনীতিক থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যম– সবাই অভিযোগ করেন, কবিতায় গ্রাস ইসরায়েলের একপেশে সমালোচনা করেছেন।

এমন সমালোচনার মুখে গুন্টার গ্রাস চুপসে না গিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যা বলার তা কবিতাটিতেই লেখা আছে। পরে জার্মানির দুটি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের বক্তব্যের প্রতি অনড় থেকে গ্রাস জানান, ইহুদি বিদ্বেষী বা ইসরায়েল বিরোধীর তকমা তাকে আহত করেছে।

গুন্টার গ্রাস বলেন, “বিতর্ক যে হবে, সেটা তো জানাই ছিল। আর আমি তো ঠিক সেটাই চেয়েছিলাম, কারণ বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা কথা বলার সময় এসে গেছে।” তবে, অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর নয় উল্লেখ করে গ্রাস বলেন, “গোটা সংবাদ মাধ্যম যেন একই সুরে কথা বলছে। কোনো বিকল্প কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে না। অনেকে মেইলে আমার সঙ্গে একমত প্রকাশ করেছেন। এই কথাটা কিন্তু সবার কাছে পৌঁছচ্ছে না।”

এসময় তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “মূল কবিতাটি একেবারেই উপেক্ষা করা হচ্ছে। তথ্যের ক্ষেত্রেও এমনটা করা হচ্ছে। সেই তথ্যে কোনো ভুল থাকলে মানুষ সেটা বলুক।”

গুন্টার গ্রাস বলেন, “ইসরায়েল যে অনেক কাল ধরে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র, তা নিয়ে খোলামেলা কথা বলা সম্ভব হয়নি। সবরকম নিয়ন্ত্রণের কাঠামোর বাইরে রয়েছে দেশটি।”

সমালোচনার জবাবে গ্রাস আরও বলেছিলেন, “ইচ্ছে করে ইরান, পরমাণু কর্মসূচি, অধিকৃত এলাকায় ইসরায়েলের বসতি নীতির মতো বিষয়বস্তুকে কবিতায় তুলে আনেননি।” এসব বিষয়বস্তু নিয়ে আলাপচারিতা বহুদিন ধরে চলে আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু অনুচ্চারিত বিষয়গুলিকেই তুলে ধরতে চেয়েছেন কবিতায়।

নোবেলজয়ী এই জার্মান ঔপন্যাসিক গুন্টার গ্রাস লুবেক শহরের একটি হাসপাতালে সোমবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮৭ বছর বয়সে মারা গেছেন। ‘টিন ড্রাম’ উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৯৯ সালে নোবেল জয় করেন।

গুন্টার গ্রাস যদিও আর এই পৃথিবীতে নেই, তবু তার সামগ্রিক সৃষ্টি যেন টিনের ড্রাম পিটিয়েই আমাদেরকে বলতে থাকবে, অবশ্যই যা বলতে হবে, তা বলতে না চাইলে বা পারলে জিব কাটো লজ্জায়।

নিউজবাংলাদেশ.কম/এসজে

নিউজবাংলাদেশ.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়