নতুন বাংলাদেশ গড়তে তরুণদের পাশে চায় জামায়াত
ছবি: সংগৃহীত
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষ্যে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে দেশের মানুষ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে জামায়াতে ইসলামী আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়। কিন্তু একটি মহল পরিবর্তনের বিরোধী। কারণ পরিবর্তন হলেই তাদের অপকর্মের পথ বন্ধ হবে, মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
তিনি বলেন, এই সংস্কৃতি বদলানোর সাহস সবার থাকে না। আমরা এই প্রচলিত ধারা বদলাতে চাই। সবাইকে নিয়ে ঐক্যের বাংলাদেশ গড়তে চাই।
সোমবার (০৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে এই ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
ডা. শফিকুর রহমান তার ভাষণে প্রথমে জুলাইয়ের শহীদদের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদেরও গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে এখনও বহু মানুষ আহত আছেন এবং তাদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন।
তিনি বলেন, জুলাই হয়েছিল কারণ আমাদের দেশ এক হয়েছিল। রাস্তায় নেমেছিল আমার তরুণ বন্ধু, মা-বোন-মেয়ে, শ্রমিক, রিকশাশ্রমিক এবং সব মেহনতি জনতা। ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও তখন এক হয়েছিল। শিক্ষক, প্রকৌশলী, ডাক্তারসহ সব শ্রেণির মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই হয়েছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জন্য। এটি ছিল কালো রাজনৈতিক ধারার পরিবর্তনের জন্য।
তিনি উল্লেখ করেন, যুগের পর যুগ ক্ষমতা কুক্ষিগত ছিল পরিবারতন্ত্রের হাতে, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে। বিশেষ করে ২০০৯ সাল থেকে জাতির ওপর এমন এক শাসকগোষ্ঠী চেপে বসে যারা মানবাধিকার, ভোটাধিকারসহ সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে ফেলে। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, আয়নাঘর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের ওপর নিপীড়ন চালায়। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর পরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচনের নামে আমাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। এই সব নিপীড়ন থেকে মুক্তি ও অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্যই এসেছিল রক্তাক্ত জুলাই।
তরুণ প্রজন্মের অগ্রগতি ও দেশপ্রেমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের তরুণরা এখন একটি নতুন দেশ দেখতে চায় বাংলাদেশ ২.০। এই দেশ তাদের হাতেই তৈরি হবে। তারা পরিশ্রমী, সাহসী, মেধাবী, পরিবর্তনকে ভালোবাসে, নতুনকে আলিঙ্গন করে, সত্য বলতে দ্বিধা করে না এবং প্রযুক্তি বোঝে। তাদের হাত ধরেই আমরা চাই জুলাইয়ের মতো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গড়ার কাজ করতে। প্রচলিত ধারা বদলাতে চাই। দেশটি বিভেদ ও বিভাজনের রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকুক, মানুষের জীবনে শান্তি ফিরুক। রাষ্ট্র হবে সবার, সরকার হবে জনগণের।
আরও পড়ুন: আমরা দেশের মালিক হব না, চৌকিদার হবো: জামায়াত আমির
জনগণকে নিরাপত্তা, সুশাসন ও ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রের মৌলিক কিছু সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তবে অনেক পরিকল্পনা প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। এ সংস্কার প্রক্রিয়াকে জারি রাখাসহ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের আয়োজন করা হচ্ছে। এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট চাই।
ভাষণে তিনি বলেন, জামায়াত প্রথমবারের মতো ‘পলিসি সামিট’-এর মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি-কৌশল জনগণের সামনে তুলে ধরেছে। দেশের ও প্রবাসী বিশেষজ্ঞরা এ প্রক্রিয়ায় অবদান রেখেছেন। জনগণের ভালোবাসা ও আল্লাহর ইচ্ছায় সরকার গঠন করলে প্রথম দিনেই ফজর নামাজ পড়েই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন শুরু হবে।
ডা. শফিকুর রহমান পুরনো শাসকগোষ্ঠীর দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ, পদ-পদবি, নীতি ও প্রতিষ্ঠান সবকিছু ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থ হাসিলের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প লুন্ঠনের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ব্যবস্থার অবসান ঘটানোই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। অতীতে যারা জামায়াতে ইসলামী থেকে জনপ্রতিনিধি হয়েছেন, তারা কেউই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হননি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, আগামী নির্বাচন জাতিকে নতুন স্বপ্নের দিকে নিয়ে যাওয়ার এক মহাসুযোগ। জনগণকে ঠিক করতে হবে আমরা আমাদের নিজেদের, আমাদের তরুণদের, নারীদের, বয়স্কদের, প্রান্তিক মানুষের জন্য কোন বাংলাদেশ চাই। আমাদের লক্ষ্য শৃঙ্খলা, নিয়মনীতি, শান্তি, উন্নতি, শোষণ-জুলুম-মুক্ত রাষ্ট্র।
নির্বাচনী ইশতেহারের বিষয় উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সততা, ঐক্য, ন্যায়বিচার, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকে আমরা ‘হ্যাঁ’ বলব; দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজিকে ‘না’ বলব।
নারী, প্রবাসী, ধর্মীয় ও সামাজিক সমতাকে কেন্দ্র করে ডা. শফিকুর রহমান প্রতিশ্রুতি দেন, “নারীরা সমাজের মূলধারায় নেতৃত্বে থাকবেন। সকলের মানবাধিকার রক্ষা করা হবে। এই বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবার। কেউ ভয়ের সংস্কৃতিতে বাস করবে না। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আঘাত করলে প্রতিরোধ করা হবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও জলবায়ু বিষয়ে তিনি বলেন, সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ব। অন্যের ভৌগলিক অখণ্ডতা সম্মান করব। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হবে।
প্রবাসীদের প্রতি তিনি বিশেষ আহ্বান জানান, তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া নতুন বাংলাদেশ স্বপ্ন পূর্ণ হবে না। প্রবাসীদের জন্য ভলান্টিয়ার প্রতিনিধি নির্বাচন এবং সংসদে কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
ডা. শফিকুর রহমান নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নৈতিকভাবে আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের পরিশ্রম ও ত্যাগের স্বীকৃতি দেন এবং শেরপুরে নিহত দলের নেতাদের স্মরণ করেন।
রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে আমানত উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কোনো উপভোগের বিষয় নয়। আমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং জিজ্ঞাসাবাদযোগ্য। ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ থাকব।
ডা. শফিকুর রহমান সমাপনীতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলের প্রার্থীদের জন্য যথাযথ ভোট দিতে এবং পরিবর্তনের মহাসুযোগ কাজে লাগাতে।
তিনি বলেন, বিগত দিনের রাজনীতি পরিহার করি। একটি নতুন বাংলাদেশ তৈরি করি, যেখানে সবাই মান-ইজ্জত ও মর্যাদা নিয়ে বাস করবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








