News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৭:২২, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

গণতন্ত্র পুনর্গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা

গণতন্ত্র পুনর্গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা

ছবি: সংগৃহীত

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। 

শুক্রবার (০৬ জানুয়ারি) বিকেল ৩টা ৪৭ মিনিটে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই ইশতেহার পেশ করেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান। সে হিসেবে এটিই তার রাজনৈতিক জীবনের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা। এর আগে পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম সংসদ নির্বাচনে দলের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং প্রতিটি নির্বাচনে তিনিই ইশতেহার ঘোষণা করেন।

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অংশ নিলেও সে সময় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দি ছিলেন। ওই বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে দলের পক্ষে ইশতেহার ঘোষণা করেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত দশম ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি।

অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হয়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান। স্বাগত বক্তব্য দেন মির্জা ফখরুল, আর পুরো অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছিলেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

অনুষ্ঠানে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দিন, কালবেলা সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিহউল্লাহ, ড. মাহদী আমিন, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক মো. রাশেদুল হক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সোহাগ আউয়ালসহ ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন।

ইশতেহার প্রণয়নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা রাষ্ট্রদর্শন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ এবং তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফাকে একসূত্রে গাঁথা হয়েছে বলে জানানো হয়।

সূচনা বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, বিগত দিনে দেশে ভোট ও জবাবদিহি ছিল না। এবার বাংলাদেশ পুনর্গঠন করার পালা। 

তিনি ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ শীর্ষক বিশেষ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে বলেন, নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে ৪ কোটি যুবক ও কয়েক লাখ নারীর জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ রয়েছে। তরুণদের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তোলাই দলের লক্ষ্য।

তারেক রহমান বলেন, বিএনপি আজ পর্যন্ত তার প্রতিশ্রুতি থেকে বিচ্যুত হয়নি। দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমান ‘৭১-পরবর্তী তলাবিহীন ঝুড়ি’ অবস্থা থেকে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং খালেদা জিয়া দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করেছিলেন। ২০২৪ সালে দেশকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করেছি আমরা। এবার ঘুরে দাঁড়ানোর পালা।

ইশতেহারে গণতন্ত্র ও জাতি গঠন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থান, সংবিধান সংস্কার, সুশাসন ও স্থানীয় সরকারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ‘আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ রাখার কথাও উল্লেখ করা হয়।

তারেক রহমান বলেন, স্বাধীনতার পর তলাবিহীন এক ঝুড়ি থেকে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথে যাত্রা শুরু করে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। ফ্যাসিবাদের পতনের পর নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এবার বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পালা।

আরও পড়ুন: নির্বাচনী শেষ জনসভা বাতিল করলো বিএনপি

জাতি গঠন এবং গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী করতে বিএনপির ৩১ দফা ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তা বাস্তবায়ন করবে বিএনপি। সমাজের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান তিনি।

গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া জবাবদিহিতা নিশ্চিত সম্ভব নয়। 

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে তিনি বলেন, আমি নিজে একপাক্ষিক বিচার বিভাগের ভুক্তভোগী। সেজন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অত্যন্ত জরুরি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেন তারেক রহমান। পাশাপাশি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে বাংলাদেশকে স্বনির্ভর দেশ হিসেবে গড়ে তোলা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতির বিস্তার রোধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান তিনি। ন্যায়পাল নিয়োগের মাধ্যমেও সুশাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন।

ইশতেহারে সামাজিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মানোন্নয়ন, ক্রীড়া ও সংস্কৃতির বিকাশ, সুষম উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারের অঙ্গীকার করা হয়েছে।

নারীর ক্ষমতায়ন ও কৃষির টেকসই উন্নয়নে বড় উদ্যোগের ঘোষণা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশের ৪ কোটি গৃহিণীর হাতে ফ্যামিলি কার্ড এবং দেড় কোটি কৃষকের হাতে কৃষক কার্ড তুলে দেওয়া হবে। 

ফ্যামিলি কার্ডের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এই অর্থ নারীর সাহস ও শক্তির উৎস হবে; সন্তানদের খাদ্য ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে। এতে সাত বছরের মধ্যে অর্থনীতিতে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্র রক্ষা ও সমৃদ্ধ করার অঙ্গীকারও করেছে দলটি। 

ইশতেহারে বলা হয়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের সিপাহী-জনতার বিপ্লব, ১৯৯০ সালের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এই ধারাবাহিকতা গণতন্ত্র রক্ষার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে।

মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের তালিকা প্রণয়ন, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিতকরণ, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কল্যাণে নীতিমালা প্রণয়ন, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাতা বৃদ্ধি এবং ভাতা ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি দূর করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা কারিকুলামে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়।

এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করা, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় যোগ্য মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে বধ্যভূমি ও গণকবর চিহ্নিত করে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ও সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে ইশতেহারে।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের তালিকা প্রণয়ন, তাদের নামে সরকারি স্থাপনার নামকরণ, পরিবারকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। আহত ও পঙ্গু ব্যক্তিদের সুচিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়।

বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের কল্যাণে একটি পৃথক বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিভাগ মামলার দ্রুত বিচার, সম্মানজনক জীবিকা এবং সন্তানদের শিক্ষার দায়িত্ব নেবে।

তারেক রহমান বলেন, জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বিএনপি সেই চর্চা অব্যাহত রাখবে।

তিনি আরও দাবি করেন, বিএনপি একমাত্র দল, যারা দেশের স্বাধীনতা, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি আন্দোলনকে ধারণ করে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়