ফ্ল্যাট দুর্নীতি মামলায় টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর গুলশান-২ এলাকায় অবৈধভাবে একটি ফ্ল্যাট গ্রহণের অভিযোগে দায়ের করা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর মামলায় ব্রিটিশ এমপি ও ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগনি টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিকসহ দুইজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। একই মামলায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর সাবেক সহকারী আইন উপদেষ্টা সরদার মোশাররফ হোসেনও পরোয়ানাভুক্ত হয়েছেন।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজ দুদকের দেওয়া অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে এ আদেশ দেন। আদালত আসামিদের গ্রেফতার-সংক্রান্ত তামিল প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৮ মার্চ দিন ধার্য করেছেন।
দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর মীর আহম্মেদ সালাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, আসামিরা পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে এই পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
মামলার সূত্রে জানা যায়, ঢাকার গুলশানে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের একটি ফ্ল্যাট কোনো অর্থ পরিশোধ ছাড়াই অবৈধভাবে দখল ও পরে নিবন্ধন করার অভিযোগে গত বছরের ১৫ এপ্রিল দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। এতে টিউলিপ সিদ্দিক ও সরদার মোশাররফ হোসেন ছাড়াও রাজউকের সাবেক সহকারী আইন উপদেষ্টা শাহ মো. খসরুজ্জামানকে আসামি করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে গুলশান-২ এলাকার ২,৪৩৬ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট দখলে নেন এবং পরে সেটি নিবন্ধন করেন। ফ্ল্যাটটির অবস্থান ছিল বাড়ি নম্বর ৫এ ও ৫বি (পুরোনো), বর্তমানে ১১৩, ১১বি (নতুন), সড়ক নম্বর ৭১; ফ্ল্যাট নম্বর বি/২০১। দুদক বলছে, নিয়মবহির্ভূত সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে আইনগত দায়িত্ব ও ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে, যা দুদক আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে দুদকের সহকারী পরিচালক এ কে এম মর্তুজা আলী সাগর গত ১১ ডিসেম্বর টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক ও সরদার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৬১/১৬৫(ক)/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারায় এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় অভিযোগপত্র দাখিল করেন। তবে মামলার আরেক আসামি শাহ খসরুজ্জামান তদন্ত স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট করলে আদালত তার বিরুদ্ধে তদন্ত তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। পরে বিষয়টি চেম্বার আদালতে গেলে দুদক ‘নো অর্ডার’ পায়, ফলে আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানানো হয়।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, গুরুতর অনিয়মের কারণে সংশ্লিষ্ট প্লটটি ইস্টার্ন হাউজিংয়ের পক্ষে হস্তান্তরযোগ্য ছিল না। তবুও শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তার প্রভাব ব্যবহার করে টিউলিপ সিদ্দিক রাজউকের আইন উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। এর ফলে কোম্পানিটিকে আমমোক্তার অনুমোদন ও ফ্ল্যাট বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয় এবং বিনিময়ে টিউলিপের কাছে ফ্ল্যাটটি হস্তান্তর করা হয়।
তদন্তে দুদক ‘অবৈধ সুবিধা গ্রহণের’ তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে। ইস্টার্ন হাউজিংয়ের একটি চিঠিতে বলা হয়েছে, টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক কোনো অর্থ পরিশোধ ছাড়াই ফ্ল্যাটটি গ্রহণ করেন। ফ্ল্যাট মালিকদের তালিকায়ও তার নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও বলা হয়, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার সময় ২০০১ সালের ১৯ মে থেকে ফ্ল্যাটটি টিউলিপের দখলে ছিল এমন তথ্য সিটি করপোরেশনে দেওয়া কোম্পানির চিঠিতে পাওয়া গেছে।
আরও পড়ুন: রিজার্ভ চুরি: ৯৩ বার পেছাল প্রতিবেদন, নতুন তারিখ ৯ এপ্রিল
তদন্তকালে জব্দ করা আয়কর নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, টিউলিপ ২০০৬-০৭ করবর্ষে আয়কর নথি খোলেন এবং ২০১৮-১৯ করবর্ষ পর্যন্ত রিটার্ন দাখিল করেন, তবে পরবর্তী করবর্ষগুলোতে আর কোনো রিটার্ন জমা দেননি। ২০০৬-০৭ থেকে ২০১৪-১৫ করবর্ষ পর্যন্ত তার রিটার্নে ‘ডেভেলপারকে অগ্রিম’ বাবদ পাঁচ লাখ টাকা দেখানো হলেও সাব-কবলা দলিল অনুযায়ী তখন থেকেই ফ্ল্যাটটি তার মালিকানায় ছিল যা কর নথিতে অসত্য তথ্য প্রদানের ইঙ্গিত দেয় বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৫-১৬ করবর্ষের রিটার্নে তিনি ফ্ল্যাটটি তার ছোট বোন আজমিনা সিদ্দিককে হেবা করেছেন বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু সংযুক্ত হেবা দলিলের ফটোকপিতে নোটারি প্রত্যয়ন থাকলেও তদন্তে দলিলটি জালিয়াতির মাধ্যমে নোটারাইজ করা হয়েছিল বলে প্রমাণ মিলেছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৩ এর পৌরকর শাখা থেকে সংগৃহীত নথিতেও সংশ্লিষ্ট ফ্ল্যাটটি টিউলিপ সিদ্দিকের নামেই অন্তর্ভুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, ২০০৪ সালের ২৩ জুন তিনি ফ্ল্যাটটির নামজারির আবেদন করেন এবং ২০১১ সালের ৩ অক্টোবর কর কর্মকর্তা, অঞ্চল-৯ বরাবর পৌরকর মওকুফের আবেদন করেন। তদন্তে দেখা গেছে, ফ্ল্যাটটি এখনও তার নামেই নামজারি রয়েছে এবং তিনি নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করেছেন।
এদিকে রাজধানীর পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দে জালিয়াতির তিনটি পৃথক মামলায় দোষ প্রমাণিত হওয়ায় টিউলিপ সিদ্দিককে দুই বছর করে মোট ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। আরেক মামলায় পূর্বাচলে মা শেখ রেহানাকে ১০ কাঠা প্লট পাইয়ে দিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ওই রায়ে শেখ রেহানাকে সাত বছর, শেখ হাসিনাকে পাঁচ বছর এবং অন্য আসামিদের পাঁচ বছর করে সাজা দেওয়া হয়।
তবে লন্ডন ও ঢাকায় প্লট ও ফ্ল্যাট নিয়ে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন টিউলিপ। অভিযোগ ওঠার পর তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকেও সরে দাঁড়ান।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান মামলাটি আগের অভিযোগগুলোর ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং সরকারি সম্পদের অবৈধ ব্যবহার ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে এটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
দুদক জানিয়েছে, আসামিদের দ্রুত গ্রেফতারের মাধ্যমে মামলাটি নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে। গ্রেফতার সংক্রান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের পর পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বিচারক।
এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের মহলেও আলোচনা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি সম্পদের সুরক্ষা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংবিধানিক কাঠামোর কার্যকারিতা পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে এই মামলা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








