News Bangladesh

|| নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১২:১৩, ১০ এপ্রিল ২০১৫
আপডেট: ০৯:১২, ১৭ জুলাই ২০২০

নেতাজির স্বজনদের ওপর পণ্ডিতজির গোয়েন্দাগিরি!

নেতাজির স্বজনদের ওপর পণ্ডিতজির গোয়েন্দাগিরি!

নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর পরিবার-পরিজনের ওপর টানা ২০ বছর ধরে গোয়েন্দাগিরি করিয়েছেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু। ইংরেজি দৈনিক মেইল টুডে শুক্রবার এ খবর দিয়ে জানিয়েছে, এ সংক্রান্ত দলিল-দস্তাবেজ ভারতের ন্যাশনাল আর্কাইভসে রক্ষিত আছে।

পত্রিকাটির দাবি করে, ওইসব দলিল এটা প্রমাণ করে যে ১৯৪৮ সাল থেকে নিয়ে ১৯৬৮ পর্যন্ত টানা ২০ বছর ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অমর নেতা বাঙালি সন্তান নেতাজীর পরিবার ছিল সরকারি গোয়েন্দাদের প্রখর নজরদারিতে। ওই ২০ বছর সময়ের মধ্যে নেহেরু প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ১৬ বছর। সে মোতাবেক প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর কাছে গোয়েন্দা দফতর সরাসরি রিপোর্ট পেশ করতো নেতাজির পরিবারের যাবতীয় বিষয়ে।

প্রসঙ্গত, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলে নেতাজীর ওপর গোয়েন্দাগিরি করতো খোদ বৃটিশ সরকার। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পরও এই অবিসংবাদিত দেশপ্রেমিকের ওপর নজরদারি জারি রাখা হয়। দলিল মোতাবেক, স্বাধীন ভারতে নেহেরুর সরকার নেতাজীর দুটি বাসস্থানের ওপর কড়া নজরদারি করতো। এর একটি হচ্ছে, কলকাতার ১ নং বুরবর্ন পার্ক আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ৩৮/২ এলগিন রোডের বাড়ি। নেহরুর গুপ্তচররা নেতাজীর পরিবারের সদস্যদের নামে আসা চিঠির কপিও সংগ্রহ করতো। এমনকি ওই পরিবারের কোনও সদস্য বিদেশ সফরে গেলে সেখানেও ছায়ার মতো তাকে অনুসরণ করা হতো।

গোয়েন্দারা নেতাজীর পরিবারের সদস্যরা কার কার সঙ্গে সাক্ষাৎ করছে আর কী কী বিষয়ে কথা হচ্ছে- এ বিষয়গুলো জানতে সদা তৎপর থাকতো। বিদেশি শত্রুর পেছনে বা দেশের অন্য কোনও ধরনের সমস্যার মূলোৎপাটনে ব্যস্ত না থেকে নেহেরুর গোয়েন্দারা কী কারণে নেতাজীর পরিবারের পেছনে অমন আদা-নুন খেয়ে লেগেছিল তা জানা না গেলেও এটা জানা গেছে, তারা সুভাষ বসুর দুই ভাতিজা শিশির কুমার বসু আর অমীয় নাথ বসুর ওপর কড়া নজরদারি চালাতো।

এরা দুজন হলেন সুভাষ বসুর বড় ভাই শরৎ চন্দ্র বসু ওরফে শরৎ বসুর ছেলে। এই দুই ভ্রাতুষ্পুত্র ছিলেন নেতাজীর খুব কাছের মানুষ। তারা নেতাজীর অস্ট্রিয়াবাসী স্ত্রীকে বেশকিছু চিঠি লিখেছিলেন।

নেতাজীর প্রপৌত্র চন্দ্র কুমার বসু এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, “গোয়েন্দাগিরি তার ওপর করা হয় যে কোনও অপরাধ করেছে। সুভাষ বসু ও তার স্বজনরা দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন। তাদের ওপর কেন কেউ নজরদারি করবে?”

একই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারক অশোক কুমার গাঙ্গুলি মেইল টুডেকে বলেন, “আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে ব্যক্তিটি দেশের স্বার্থে তার সবকিছু অর্পণ করেছিলেন, স্বাধীন ভারতের সরকার তার পরিবারের ওপরই গোন্দোগিরি করছিলো।”

ক্ষমতাসীন বিজেপির সরকারি মুখপাত্র এমজে আকবরের মতে, এ ধরনের গোয়েন্দাগিরির একটিই কারণ থাকতে পারে। তিনি বলেন, “সুভাষ বসু মারা গেছেন না বেঁচে আছেন- এ বিষয়ে সরকারের কাছে নিশ্চিত কোনও খবর ছিল না। তারা মনে করেছিল তিনি বেঁচে আছেন এবং পরিবার-পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেস পেরেশান ছিল কেন? নেতাজি ফিরে আসলে দেশ তো তাকে স্বাগত জানাতো। এটাই ছিল ভয়ের কারণ। বসু ক্যারিশমাটিক নেতা ছিলেন আর ১৯৫৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসকে তার কাছে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতো। এটা অন্তত বলা যায়- যদি বসু বেঁচে থাকতেন তাহলে যে কাজ ১৯৭৭ সালে হয়েছে, তা ১৫ বছর আগেই হয়ে যেতো।”

প্রসঙ্গত, ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের (আইবি) নথিপত্র খুব কম ক্ষেত্রেই গোপনীয়তার বেড়া পাড় হতে পারে। সুভাষ বসুর পরিবারের ওপর গোয়েন্দাগিরির মূল দলিপত্র এখনও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হেফাজতে রয়েছে। পত্রিকাটি জানায়, ‘ইন্ডিয়াস বিগেস্ট কাভার-আপ’ বইয়ের লেখক অনুজ ধর চলতি বছরের জানুয়ারিতে ওইসব দলিল-দস্তাবেজ ন্যাশনাল আর্কাইভসে খুঁজে পান। তার মতে, এসব অতিগুরুত্বপূর্ণ গোপনীয় নথি ভুলক্রমে ‘গোপনীয়তা’ শ্রেণির বাইরে চলে এসেছিল।

তবে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ব্রিটিশবিরোধী মুক্তিসংগ্রামী সুভাষ বসুর পরিবারের ওপর গোয়েন্দাগিরির নির্দেশ দিয়েছেন- এমন গোপনীয় গোয়েন্দা রিপোর্টের বিরোধীতা করেছে কংগ্রেস। শুক্রবার দেওয়া এক বিবৃতিতে দলটি জানিয়েছে, দুই নেতার মাঝে চমৎকার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল।

কংগ্রেস নেতা পিসি চাক্কো বলেন, “এটা মিডিয়ার তৈরি গল্প এবং এটা ইতিহাসের সঠিক বয়ান নয়। সব ধরনের মতপার্থক্য সত্ত্বেও পণ্ডিতজি (নেহেরু) ও সুভাষ চন্দ্র বসুর মাঝে চমৎকার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। তাদের মতপার্থক্যটা ছিল স্রেফ স্বাধীনতা অর্জনের কৌশল নিয়ে। নেহেরু শান্তিপূর্ণ উপায়ে স্বাধীনতা অর্জনের পক্ষে ছিলেন আর সুভাস চন্দ্র বসুর এক্ষেত্রে ভিন্নমত ছিল।”

এদিকে, নেহেরুর বিরুদ্ধে সুভাষ বসুর পরিবারের ওপর গোয়েন্দাগিরির অভিযোগের সরাসরি নিন্দা করেছেন কংগ্রেস জেনারেল সেক্রেটারি দিগ্বিজয় সিং। তিনি দাবি করেন, এটা হচ্ছে নেহেরু-গান্ধি পরিবারকে হেয় করার একটা অপচেষ্টা।

তার মতে, যেহেতু বিজেপি আর সংঘ পরিবার গান্ধিদের বিরোধী তাই তারা এসব ঘটাচ্ছে। তিনি বলেন, “কারণ, হিন্দু আর মুসলমানদের বিভক্ত করে রাখার তাদের যে নীতি, নেহেরুজি সব সময়েই ছিলেন এর বিরুদ্ধে। তাদের অবশ্যই উচিৎ সংবাদের সূত্র প্রকাশ করা। আমি এ ধরনের সংবাদের নিন্দা জানাই।
ভারত সরকারের মতানুসারে, ১৯৪৫ সালের ৮ আগস্ট তাইওয়ানে মারা যান আজাদ হিন্দ ফৌজের সংগঠক নেতাজী সুভাস চন্দ বসু।

মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ‘দেশনায়ক’ উপাধি পাওয়া নেতাজী সুভাষ বসুর মৃত্যু বা অন্তর্ধান- আজও একটি অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে। একটি মতে নেতাজী রাশিয়ার হাতে বন্দী অবস্থায়, সাইবেরিয়াতে মৃত্যুবরণ করেন। আর একটি মতে, বর্তমানে রেনকোজি মন্দিরে রাখা নেতাজির চিতাভষ্ম পরীক্ষা করে জানা গেছে -ওই  দেহ ভস্ম তাঁর নয়। আসলে ভারতবর্ষে নেতাজির তুমুল জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে একদল উঁচুতলার ভারতীয় নেতা এবং ইংরেজ সরকার মিলিতভাবে ষড়যন্ত্র করে নেতাজীকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়। তাই ভারত সরকার কখনো নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জনসমক্ষে আনেনি। অনেকের মতে, ফইজাবাদের ভগবান জি ওরফে গুনমানি বাবা হলেন নেতাজি। কিন্তু এ ব্যাপারটি আজও স্পষ্ট নয়। আরেকটি মতে, নেতাজী নাকি আজও জীবিত।
সূত্র: নবভারত টাইমস.কম, ইন্ডিয়াটাইমস.কম, উইকিপিডিয়া
নিউজবাংলাদেশ.কম/একে       

   
   

 

নিউজবাংলাদেশ.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়