আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২১:০৮, ২৫ মে ২০২৬

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় টানা তিন বছর কোরবানিহীন ঈদ

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় টানা তিন বছর কোরবানিহীন ঈদ

ফাইল ছবি

পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে এলেই একসময় গাজার বিভিন্ন এলাকায় শুরু হতো কোরবানির পশু কেনাবেচার ব্যস্ততা। স্থানীয় খামারগুলোতে ভিড় জমাতেন ক্রেতারা, বাজারগুলো মুখর থাকত ভেড়া, ছাগল ও গরুর ডাকাডাকিতে। কিন্তু টানা যুদ্ধ, অবরোধ ও ধ্বংসযজ্ঞে সেই চিত্র এখন প্রায় পুরোপুরি অতীত। গাজায় এখন কোরবানির পশু শুধু দুর্লভই নয়, অধিকাংশ মানুষের নাগালেরও বাইরে। ফলে টানা তৃতীয় বছরের মতো ঈদুল আজহার অন্যতম প্রধান ধর্মীয় অনুষঙ্গ কোরবানি থেকে কার্যত বঞ্চিত হচ্ছেন উপত্যকাটির লাখো ফিলিস্তিনি।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের এক বিস্তৃত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গাজার পশুসম্পদ খাত প্রায় সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। একসময় যিনি গাজার অন্যতম বড় পশু খামারি হিসেবে পরিচিত ছিলেন, সেই মাজেন আল-জেরজাউই এখন আর পশু বিক্রি করেন না। ঈদের মৌসুমে শত শত ভেড়া ও গরু বিক্রির বদলে বর্তমানে তিনি ছোট একটি রেস্তোরাঁ চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সেখানে তাকে নির্ভর করতে হচ্ছে সীমিত পরিমাণে গাজায় প্রবেশ করতে দেওয়া হিমায়িত মাংসের ওপর।

গাজা সিটির বাসিন্দা জেরজাউই জানান, বছরের এই সময়টাতে তিনি সাধারণত প্রায় ২০০টি ভেড়া ও গরু বিক্রি করতেন। কিন্তু এখন তার কাছে একটি পশুও নেই। 

তার ভাষায়, গাজায় জীবন্ত পশু প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পশুপালন ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। 

তিনি অভিযোগ করেন, ইসরায়েল গাজার মানুষের সঙ্গে এমন আচরণ করছে যেন তারা এখানে স্থায়ী বাসিন্দা নয়; কেবলমাত্র ন্যূনতমভাবে টিকে থাকার মতো সীমিত সুযোগই তাদের দেওয়া হচ্ছে।

ঈদুল আজহা মুসলমানদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। এ সময় সামর্থ্যবান মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানি করেন এবং সেই মাংস পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে বণ্টন করেন। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি বছর ঈদের আগে গাজায় প্রায় ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার ভেড়া ও বাছুর আমদানি করা হতো। স্থানীয় খামারগুলোর পাশাপাশি বাইরের আমদানির মাধ্যমে কোরবানির বাজার সচল থাকত। কিন্তু ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে সেই সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

গাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধে উপত্যকাটির গবাদিপশু খাতের ৯০ শতাংশেরও বেশি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু পশুখামার নয়, গোয়ালঘর, খাদ্য গুদাম, পশু চিকিৎসা কেন্দ্র, কৃষি অবকাঠামো ও পানির উৎসও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি জীবন্ত পশু আমদানির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

যুদ্ধের আগে গাজায় একটি ভেড়ার দাম যেখানে ৫০০ থেকে ৬০০ ডলারের মধ্যে ছিল, বর্তমানে হাতে গোনা যে কয়েকটি পশু অবশিষ্ট রয়েছে, সেগুলোর দাম উঠেছে প্রায় ৭ হাজার ডলার পর্যন্ত। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য পশু কেনা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

মাজেন আল-জেরজাউই বলেন, বিদেশে বসবাসকারী অনেক ফিলিস্তিনি এখনও গাজায় থাকা স্বজনদের জন্য কোরবানির পশু কিনতে যোগাযোগ করেন। তবে তিনি তাদের এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেন। 

তার মতে, একটি ভেড়ার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করার চেয়ে সেই টাকা দিয়ে হিমায়িত মাংস কেনা কিংবা কোনো পরিবারের জরুরি প্রয়োজন মেটানো বেশি বাস্তবসম্মত। 

তিনি বলেন, একটি পশুর জন্য যে পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হচ্ছে, তা দিয়ে একটি পরিবারের বিয়ের আয়োজন পর্যন্ত করা সম্ভব।

আরও পড়ুন: আজই হতে পারে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি: রুবিও

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর তথ্য বলছে, গত বছরের নভেম্বর নাগাদ গাজার অন্তত ৮০ শতাংশ ভেড়া এবং ৭০ শতাংশ ছাগল যুদ্ধ, বোমা হামলা ও খাদ্য সংকটের কারণে মারা গেছে বা ধ্বংস হয়েছে। একসময় যে পশুসম্পদ খাত গাজার তাজা মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল, সেটি এখন কার্যত নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে।

জেরজাউই জানান, খাদ্য সংকট এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছিল যে অনেক সময় পশুগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে পাস্তা কিংবা যা পাওয়া গেছে তাই খাওয়াতে হয়েছে। কিন্তু আশপাশে বিমান হামলা ও বিস্ফোরণের কারণে বহু পশু মারা যায়। 

তার মতে, গাজার প্রায় সব খামারির ক্ষেত্রেই একই ধরনের পরিস্থিতি ঘটেছে।

তিনি আরও বলেন, বারবার জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি পশুপালন খাতকে চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে। বোমা হামলা থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালানোর সময় অনেক পরিবার আর পশুর যত্ন নিতে পারেনি। বাধ্য হয়ে তারা কম দামে পশু বিক্রি করেছে কিংবা দ্রুত জবাই করে ফেলেছে। 
জেরজাউইর ভাষায়, প্রতিটি উচ্ছেদ আদেশের পর গাজায় গবাদিপশুর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। নিজের পরিবারকে রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে পশু বাঁচিয়ে রাখা—দুটি কাজ একসঙ্গে করা অনেকের পক্ষেই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

গাজার কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে যেখানে উপত্যকাটিতে প্রায় ৬০ হাজার ভেড়া ও ছাগল ছিল, বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৩ হাজারে। গরু ও বাছুর প্রায় সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেছে। 

কৃষি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাফাত আসালিয়া জানান, বর্তমানে যে অল্প কিছু পশু টিকে আছে, সেগুলোর বেশিরভাগই যাযাবর পশুপালকদের কাছে রয়েছে এবং ঈদের বাজারে বিক্রির জন্য পাওয়া যাচ্ছে না। 

তিনি আরও বলেন, পানির কূপ ও অবকাঠামো সচল না থাকায় এই খাত পুনরুদ্ধারেরও বাস্তব কোনো সম্ভাবনা আপাতত নেই।

গাজার সাধারণ মানুষের কাছেও ঈদুল আজহার পরিচিত আবহ এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। গাজা সিটির স্কুলশিক্ষক মুহাম্মদ আবু রিয়ালা বলেন, মনে হচ্ছে তারা তিন বছর ধরে ঈদই উদযাপন করতে পারছেন না। কোরবানি দেওয়া এবং সেই মাংস অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার যে আনন্দ ও সামাজিক অনুভূতি ছিল, তা এখন বিলীন হয়ে গেছে। 

তার মতে, কোরবানি ও ভাগাভাগির সুযোগ না থাকলে ঈদের পূর্ণতা অনুভব করা যায় না।

তিনি বলেন, সংকট শুধু পশুর অভাবেই সীমাবদ্ধ নয়; অধিকাংশ পরিবার এখন নিত্যদিনের খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে। অনেক মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে হিমায়িত মাংস পর্যন্ত খেতে পারেননি। গাজায় যে সীমিত খাদ্যপণ্য প্রবেশ করে, তা পুরোপুরি সীমান্ত পরিস্থিতি ও পারাপারের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বাজারে প্রায়ই মৌলিক খাদ্যসামগ্রী উধাও হয়ে যায় এবং দামের অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা দেয়।

জাতিসংঘ সমর্থিত ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি)-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ নাগাদ গাজার প্রায় ৭৭ শতাংশ মানুষ, অর্থাৎ প্রায় ১৬ লাখ বাসিন্দা তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল। যুদ্ধবিরতির বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও মানবিক সহায়তা ও বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশে কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্ত বন্ধের কারণে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি।

মুহাম্মদ আবু রিয়ালার মতে, গবাদিপশু আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শুধু খাদ্য সংকট নয়, বরং পুরো একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে। 

তিনি বলেন, যদি গাজায় পশু প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হতো, তাহলে পশু চিকিৎসক, খামারি, কৃষক, কসাই, জৈবসার উৎপাদক এবং রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের মতো বহু পেশাজীবী উপকৃত হতেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে গাজার সমাজকে ক্রমশ অচল ও নির্ভরশীল করে ফেলা হচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়