আজই হতে পারে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি: রুবিও
ফাইল ছবি
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে মধ্যপ্রাচ্যে এক নাটকীয় কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে যেকোনো মুহূর্তে একটি যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে।
সোমবার (২৫ মে) মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভারতের নয়াদিল্লি থেকে আগ্রার ঐতিহাসিক তাজমহল পরিদর্শনের প্রাক্কালে সাংবাদিকদের জানান, দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে আলোচনার টেবিলে বর্তমানে একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত, তাৎপর্যপূর্ণ ও শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক প্রস্তাব রয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের প্রত্যাশা ছিল গত রাতেই (রবিবার) হয়তো কোনো সুনির্দিষ্ট অগ্রগতির ঘোষণা আসবে, তবে তা না হলেও সোমবারই যেকোনো সময় এই বহুল প্রতীক্ষিত চুক্তির খবর মিলতে পারে। তবে একই সাথে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে রুবিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ওয়াশিংটন তেহরানের সাথে হয় একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য চুক্তি করবে, অথবা তাদের বিরুদ্ধে ‘বিকল্প কোনো উপায়ে’ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই সম্ভাব্য চুক্তির মূল শর্তগুলোর একটি আংশিক রূপরেখা দিয়ে বলেন, এর মধ্যে ৬০ দিনের একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি বৃদ্ধি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও সময়-সীমিত আলোচনা এবং ইরানের অবরুদ্ধ করে রাখা আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয় এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে, যা ইরান বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছিল।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই চরম আশাবাদের বিপরীতে হোয়াইট হাউজের তরফ থেকে কিছুটা সতর্ক ও সংযত অবস্থান লক্ষ করা গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে তার কর্মকর্তাদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা এই চুক্তি সম্পাদনে কোনো ধরনের তাড়াহুড়ো না করেন।
ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যতক্ষণ না একটি চুক্তি চূড়ান্তভাবে সম্পাদিত, মার্কিন প্রশাসন কর্তৃক প্রত্যয়িত এবং উভয় পক্ষ দ্বারা স্বাক্ষরিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীতে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌবাহিনীর জারিকৃত কঠোর অবরোধ পূর্ণ শক্তি ও কার্যকারিতায় বলবৎ থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শনিবারের তুলনায় রোববার ট্রাম্পের এই অবস্থান কিছুটা ভিন্ন ও সংযত, কারণ এর আগের দিন তিনি নিজেই দাবি করেছিলেন যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, তিনি কোনো অবস্থাতেই একটি দুর্বল চুক্তি করবেন না এবং যারা নিজেরা ব্যর্থ হয়ে কিংবা কিছু না জেনে তার কূটনীতির সমালোচনা করছেন, তাদের কথায় তিনি কান দেন না। এই চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে ট্রাম্প পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করতে হবে। যদিও তেহরান শুরু থেকেই দাবি করে আসছে যে তাদের এই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
উল্লেখ্য, সংঘাত শুরুর প্রাক্কালে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছিল, যা পরমাণু বোমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতার ‘অস্ত্র-গ্রেড’ স্তর থেকে মাত্র কয়েক ধাপ দূরে ছিল। এই কারণে ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বিশ্ববাসীকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন যে, ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পেছনে ছুটছে না এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের একাংশের দাবি অনুযায়ী, এই চুক্তির আওতায় ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে রাজি হতে পারে।
আরও পড়ুন: যুদ্ধ অবসানে ট্রাম্প-ইরান সমঝোতা: মধ্যপ্রাচ্যে নাটকীয় মোড়
এদিকে মার্কিন সরকারের ভেতরেই এই সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে তীব্র মতবিরোধ ও রাজনৈতিক সমালোচনা শুরু হয়েছে। ট্রাম্পের কট্টর মিত্র হিসেবে পরিচিত সিনেটর টেড ক্রুজ এই সমঝোতার প্রচেষ্টাকে একটি ‘বিপজ্জনক ভুল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে মার্কিন সিনেট সশস্ত্র বাহিনী কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, মাত্র ৬০ দিনের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির অর্থ হবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে অর্জিত সমস্ত সাফল্য ও আত্মত্যাগকে সম্পূর্ণ বৃথা করে দেওয়া।
রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামও এই উদ্যোগের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, এমন কোনো চুক্তি মেনে নেওয়া যায় না যা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে পুনরায় একটি প্রভাবশালী পরাশক্তি হিসেবে নিজেদের জাহির করার সুযোগ তৈরি করে দেয়, যা দেখে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগবে যে আদতে এই যুদ্ধ শুরুই বা কেন হয়েছিল। মার্কিন অভ্যন্তরীণ এই বিরোধের পাশাপাশি তেহরানের রাজনৈতিক অবস্থানও বেশ জটিল আকার ধারণ করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, যদিও আলোচনার টেবিলে থাকা অধিকাংশ বিষয়ে উভয় পক্ষ একটি যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পেরেছে, তবুও চুক্তিতে স্বাক্ষর করা কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র এমনটা ভাবা ভুল হবে। তিনি পরিস্থিতিটিকে একই সাথে “খুব কাছে এবং আবার খুব দূরে” বলে অভিহিত করেছেন।
অন্যদিকে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ওয়াশিংটন এখনো তেহরানের কিছু মৌলিক দাবি পূরণে বাধা সৃষ্টি করছে, যার মধ্যে ইরানের বিদেশে জব্দকৃত বিপুল পরিমাণ তহবিল অবিলম্বে নিঃশর্তে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি অন্যতম।
এর পাশাপাশি দুই দেশের যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সূত্রে জানা গেছে। সিবিএস নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম দিন ইসরাইলি বিমান হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার সময় তার ছেলে ও বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই গুরুতর আহত হন। তিনি বর্তমানে মার্কিন ও ইসরাইলি নজরদারি এড়াতে কোনো একটি অজ্ঞাত স্থানে আত্মগোপন করে আছেন, যার ফলে তেহরানের নিজস্ব শান্তিদূতদের সাথে তার জরুরি যোগাযোগ রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে এবং এটিই মূলত ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনার গতিকে মন্থর করে দিচ্ছে। মার্কিন প্রশাসনের এই কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি চলমান সংকট নিরসনে এশিয়ার পরাশক্তি চীন ও পাকিস্তান একযোগে মাঠে নেমেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল অসিম মুনির বর্তমানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের সফরে বেইজিংয়ে রয়েছেন, যেখানে তারা চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সাথে অত্যন্ত গোপনীয় দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন।
বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে তারা পাকিস্তানের সাথে যৌথভাবে ইতিবাচক অবদান রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর আগে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভী সরাসরি তেহরান সফর করে ইরান যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসানের লক্ষ্যে মধ্যস্থতার একটি জোরালো ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন, যা এখন চীনের সহায়তায় নতুন মাত্রা পাচ্ছে।
তবে ভারতের নয়াদিল্লি ছাড়ার আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইসরাইলের সুরক্ষায় ওয়াশিংটনের অনড় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার সবসময়ই থাকবে এবং লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ যদি ইসরাইলের দিকে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোণ হামলা চালায়, তবে তেল আবিবের পাল্টা জবাব দেওয়ার পূর্ণ অধিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করবে।
এই দীর্ঘস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের অভ্যন্তরে ব্যাপক ও নজিরবিহীন সামরিক বিমান হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান ইসরাইল এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন মিত্র রাষ্ট্রগুলোর ওপর পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় এবং একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লাইফলাইন খ্যাত হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়, যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম রাতারাতি আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। এপ্রিলের শুরুতে একটি প্রাথমিক ও ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সমস্ত সমুদ্রবন্দরের ওপর কঠোর নৌ অবরোধ আরোপ করে। তবে সোমবার একটি সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার সাথে সাথেই আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় প্রায় ৬ শতাংশ কমে গত দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে এবং একই সাথে এশিয়ার প্রধান প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে সূচকের বড় ধরনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। তবে এই চুক্তিটি যদি সোমবারই চূড়ান্ত হয়ে যায়, তবুও এর বাস্তব সুফল পেতে বিশ্ব বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচল শিল্পের বেশ কয়েক মাস সময় লেগে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিপিং জায়ান্ট মায়ার্স্ক-এর সাবেক পরিচালক এবং ভেসপুচি মেরিটাইমের প্রধান নির্বাহী লার্স জেনসেন বিবিসি রেডিও ৪-এর এক সাক্ষাৎকারে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, চুক্তি স্বাক্ষরের খবর আসার পরও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) এবং আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো এই যুদ্ধাঞ্চল দিয়ে পুনরায় জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা অবলম্বন করবে। সংকট পূর্ববর্তী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে এবং সাগরের বাণিজ্যিক রুটগুলোর নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত করতে জাহাজ চলাচল শিল্পের অন্তত কয়েক মাস সময় লাগবে, কারণ তারা যেকোনো বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিস্থিতি কতটা স্থায়ী হয় তা পর্যবেক্ষণ করতে দ্বিধাবোধ করবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








