যুদ্ধ অবসানে ট্রাম্প-ইরান সমঝোতা: মধ্যপ্রাচ্যে নাটকীয় মোড়
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় আসতে যাচ্ছে। দীর্ঘ তিন মাসের যুদ্ধাবস্থার পর বিশ্ব অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ খ্যাত হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করাসহ মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে ওয়াশিংটন ও তেহরান।
শনিবার (২৩ মে) বিকেলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক বার্তার মাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন যে, ইরানের সাথে যুদ্ধ সমাপ্তির লক্ষ্যে একটি খসড়া সমঝোতা স্মারক ‘মোটামুটি চূড়ান্ত’ করা হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক নমনীয় অবস্থানকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একপ্রকার রাজনৈতিক সমঝোতা বা কৌশলগত পিছুটান হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে, যেখানে যুদ্ধের শুরু থেকে ইরানের দাবিগুলোকেই চুক্তির প্রধান শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সেখানে ট্রাম্প অনেকটা বাধ্য হয়েই এই চুক্তিতে সম্মতি দিচ্ছেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
যদিও রবিবার (২৪ মে) মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন এই আলোচনায় ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’র কথা স্বীকার করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, আলোচনা এখনও চূড়ান্ত নয় এবং আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট ঘোষণা আসতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্র এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই চুক্তির খসড়ায় মূলত ১৪টি প্রধান শর্তের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ৬০ দিনের একটি অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি। এই সমঝোতার আওতায় ইরান প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী কোনো জাহাজের ওপর কর বা টোল আরোপ করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচল স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে তেহরানকে তাদের সমুদ্রসীমা ও প্রণালি থেকে পাতা সমস্ত সামুদ্রিক মাইন এবং নিজেদের নৌ অবরোধ সরিয়ে নিতে হবে।
ইরান এই শর্তগুলো যথাযথভাবে পূরণ করার পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও দেশটির বন্দরগুলোর ওপর থেকে নিজেদের আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ইরানের তেল শিল্প ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর থাকা কিছু কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেবে। তবে এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। তেহরানকে এই মর্মে দৃঢ় অঙ্গীকার করতে হবে যে তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। কিন্তু তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুরোপুরি স্থগিত রাখা এবং বর্তমানে মজুত থাকা উচ্চ-মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশ থেকে অপসারণ করার বিষয়টি এই মূল চুক্তিতে চূড়ান্ত না করে, পরবর্তী ৩০ থেকে ৬০ দিনের আলোচনার টেবিলে রাখতে রাজি হয়েছে দুই পক্ষ।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে বর্তমানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ দশমিক ৯ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধির একেবারেই কাছাকাছি। প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় ইরান কীভাবে এই ইউরেনিয়াম হস্তান্তর বা ধ্বংস করবে, তা আগামী ৬০ দিনের পরবর্তী আলোচনায় নির্ধারিত হবে।
প্রাথমিক খসড়া অনুযায়ী, এই মজুতের একটি অংশ হয়তো তরলীকৃত (ডাইলুট) করা হবে এবং বাকি অংশ তৃতীয় কোনো দেশে সম্ভবত রাশিয়ায় স্থানান্তর করা হতে পারে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে ইরানের ওপর থেকে অন্যান্য অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের প্রায় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল সম্পদ বা তহবিল ফিরিয়ে দেওয়া নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী আলোচনায় অংশ নেবে। তবে ৬০ দিনের এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়সীমা শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরান সীমান্তে অবস্থানরত বা হামলার জন্য নিয়োজিত তাদের কোনো সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করবে না। দুই দেশের মধ্যে সম্পূর্ণ যাচাইকৃত একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পরই কেবল মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করবে ওয়াশিংটন। এর পাশাপাশি, মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক পরিস্থিতি শান্ত করতে এই সমঝোতার অধীনে লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ বন্ধ করার পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এখানে একটি কঠোর শর্ত রাখা হয়েছে যে, যুদ্ধবিরতি চলাকালীন হিজবুল্লাহ যদি পুনরায় অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করে, তবে ইসরায়েলকে আগাম সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে, যার মধ্যে লেবাননের অভ্যন্তরে বিমান ও ড্রোন হামলা চালানোর বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
আরও পড়ুন: পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন-তেহরান শান্তি চুক্তির খসড়া প্রকাশ
এই সমঝোতা প্রক্রিয়ার পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক কূটনীতি ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর একটি বিশাল মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা কাজ করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টে কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান, জর্ডান, মিশর, তুরস্ক এবং বাহরাইনের রাষ্ট্রপ্রধান ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে দীর্ঘ ফোনালাপের পর এই ঘোষণা দেন।
তিনি আঞ্চলিক ও মুসলিম বিশ্বের নেতাদের নাম ধরে ধরে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তাদের সক্রিয় মধ্যস্থতা ও অনুরোধের কারণেই ইরানের সঙ্গে একটা চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অনুরোধেই তিনি পুনরায় সামরিক হামলা শুরু করার সিদ্ধান্ত ‘স্থগিত’ করেছেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, উভয় পক্ষের মধ্যে সংলাপ সহজতর করতে ইসলামাবাদ ‘খুব শীঘ্রই’ পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বিপাক্ষিক আলোচনার আতিথেয়তা করতে প্রস্তুত। একইভাবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান এবং মিশরের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় থেকে দেওয়া পৃথক বিবৃতিতে এই কূটনৈতিক অগ্রগতির প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করে সব পক্ষকে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এই চুক্তিতে ট্রাম্পের রাজি হওয়ার পেছনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি প্রচ্ছন্ন ও বড় ভূমিকা রয়েছে। সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আরব আমিরাত সফরের অত্যন্ত গোপন সংবাদ সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর আবুধাবি ও তেল আবিবের মধ্যে যে সূক্ষ্ম কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, এই চুক্তি হয়তো তারই একটি পরোক্ষ সমীকরণ।
যদিও এই সম্ভাব্য চুক্তিটি এখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচক এবং অন্যান্য অংশীদার দেশগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, তবে এর মধ্যেই এটি নিয়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষ শুরু হয়েছে। আমেরিকার নীতিগত কট্টরপন্থী বা ‘হকিশ’ রাজনীতিকরা এই চুক্তিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘অপমানজনক’ ও ‘লজ্জাজনক পরাজয়’ আখ্যা দিয়ে ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করছেন।
অন্যদিকে, ইসরায়েল প্রকাশ্যে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না জানালেও, তারা যে এই খসড়া সমঝোতায় মোটেও খুশি নয়, তা স্পষ্ট।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইতিমধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো অঞ্চল থেকে আসা হুমকির বিরুদ্ধে ইসরায়েল তার স্বাধীন সামরিক পদক্ষেপ বজায় রাখবে।
নেতানিয়াহু আরও শর্ত দিয়েছেন যে, ইরানকে তার পুরো পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ এবং সব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশ থেকে নিঃসশর্তভাবে অপসারণ করতে হবে, অন্যথায় ট্রাম্প যেন কোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর না করেন। ফলে শেষ পর্যন্ত মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও ইসরায়েলের কঠোর অবস্থানের মুখে ট্রাম্প তার এই শান্তিবাদী আশাবাদে অটল থাকতে পারবেন, নাকি যেকোনো মুহূর্তে পুনরায় ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে ইরানকে ধ্বংস করার সামরিক হুমকিতে ফিরে যাবেন তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর সংশয় রয়েই গেছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








