News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১১:৫৫, ১ জুন ২০২৬

রণক্ষেত্র মতিঝিল: ইসলামী ব্যাংকের সামনে পুলিশ-গ্রাহক সংঘর্ষ

রণক্ষেত্র মতিঝিল: ইসলামী ব্যাংকের সামনে পুলিশ-গ্রাহক সংঘর্ষ

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকার বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলে দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির প্রধান কার্যালয়ের সামনে তীব্র উত্তেজনা, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ব্যাংকটির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক বিতর্কিত ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ গ্রাহকদের ওপর পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। 'ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম'-এর ব্যানারে আয়োজিত এই বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পুরো দিলকুশা ও মতিঝিল এলাকা। সংঘর্ষে ফোরামের অন্তত চারজন গ্রাহক গুরুতর আহত হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ব্যাংক সূত্র জানায়, সোমবার (০১ জুন) সকাল ৯টা থেকেই মতিঝিলে অবস্থিত ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে কয়েক শ সাধারণ গ্রাহক, আমানতকারী ও সুবিধাভোগী সমবেত হতে শুরু করেন। 'ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম' ও 'ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম'-এর ব্যানারে ব্যানার-ফেস্টুন হাতে নিয়ে তারা নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিক্ষোভকারীদের ব্যানারে ও স্লোগানে উচ্চারিত হতে থাকে ‘গ্রাহক বাঁচতে চায়, খুরশীদ আলমকে চায় না’, ‘কে আলম নয়, চেয়ারম্যান পদত্যাগ করো’। আন্দোলনকারীরা যখন ব্যাংকের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ ও স্লোগান দিচ্ছিলেন, তখন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পুলিশ তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য আকস্মিক অভিযান শুরু করে। পুলিশের এই অ্যাকশনের মুখে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয় এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, পুলিশ প্রথমে বিক্ষোভকারীদের জটলা ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করলে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে পুলিশ কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে লাঠিপেটা শুরু করে। এর জবাবে বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরাও লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন এবং পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে পুরো এলাকা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ উপর্যুপরি টিয়ারগ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান থেকে রঙিন পানি নিক্ষেপ করে। বিকট শব্দে সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণ ও টিয়ারগ্যাসের ঝাঁঝালো ধোঁয়ায় পুরো দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অফিসগামী সাধারণ মানুষ ও পথচারীরা দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করেন এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোতে একপ্রকার স্থবিরতা নেমে আসে।

পুলিশের আক্রমণ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় বেশ কিছু আন্দোলনকারী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। 

ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের শীর্ষ নেতৃত্ব দাবি করেছেন, পুলিশের এই অযৌক্তিক ও বর্বর বলপ্রয়োগের কারণে তাদের অন্তত চারজন ফোরাম সদস্য ও সাধারণ আমানতকারী গুরুতর জখম হয়েছেন। রক্তাক্ত অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে রাজধানীর বিভিন্ন বেসরকারি ও সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসাধীন আহতদের নাম-পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। 

আরও পড়ুন: আদ-দ্বীন হাসপাতালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা

অন্যদিকে, পুলিশের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো হতাহতের বা গ্রেপ্তারের সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়নি।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া গ্রাহক ও ফোরামের নেতারা অভিযোগ করেন, সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ একটি কর্মসূচিতে পুলিশ প্রশাসনের এই ধরনের বলপ্রয়োগ চরম অনভিপ্রেত ও অন্যায়। 

গ্রাহক ফোরামের নেতা শাহীন আহমেদ খান সম্প্রতি এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, ইসলামী ব্যাংক কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার নয়, এটি এ দেশের কোটি গ্রাহকের কষ্টার্জিত আমানতের পবিত্র আমানতদার। 

বিক্ষোভকারীরা দাবি করেন, সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলম বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর থাকাকালে বিতর্কিত 'এস আলম গ্রুপের' সমস্ত অনিয়ম ও লুটেরা এজেন্ডা বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান নায়ক ও বিশ্বস্ত দোসর ছিলেন। তার মতো একজন চিহ্নিত সুবিধাভোগী ও ফ্যাসিস্ট দোসরকে দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসানোর অর্থ হলো ব্যাংকটিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা এবং নতুন করে আমানত লুটপাটের চক্রান্তে লিপ্ত হওয়া। এই রাজনৈতিক ও বিতর্কিত নিয়োগ অবিলম্বে বাতিল করার জোর দাবি জানান তারা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২৪ মে (রবিবার) ঈদের ছুটির ঠিক আগের শেষ কর্মদিবসের বিকেলে এক নজিরবিহীন নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম জুবায়দুর রহমান কর্মকর্তাদের প্রবল চাপ ও বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তার পদত্যাগের মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। 

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্নর ও চার ডেপুটি গভর্নরের পদত্যাগ দাবিতে তীব্র আন্দোলন শুরু করলে মো. খুরশীদ আলম এবং আরেক ডেপুটি গভর্নর কাজী ছাইদুর রহমান পদত্যাগ করে পালিয়ে বাঁচেন। সেই গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদচ্যুত ও বিতর্কিত একজন কর্মকর্তাকে পুনরায় দেশের শীর্ষ ব্যাংকের দায়িত্ব দেওয়ায় সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

পুলিশের প্রথম দফার অভিযানের পর আন্দোলনকারীরা সাময়িকভাবে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও, বেলা বাড়ার সাথে সাথে তারা আবারও সংগঠিত হয়ে দিলকুশা ও ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের আশপাশের বিভিন্ন গলিতে অবস্থান নেন। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিক্ষোভকারীরা সুযোগ বুঝে পুনরায় প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন, যার ফলে ওই এলাকায় চরম থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ও ব্যাংকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসলামী ব্যাংক ভবনের চারপাশসহ পুরো মতিঝিল এলাকায় বিপুলসংখ্যক অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশের সাঁজোয়া যান, জলকামান ও দাঙ্গা দমন ফোর্সকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে এবং ব্যাংকের আশপাশে সাধারণ মানুষের চলাচল কঠোরভাবে সুনিয়ন্ত্রিত করা হচ্ছে। সাধারণ গ্রাহকদের আশঙ্কা, যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনা না করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এমন বিতর্কিত নিয়োগ বহাল রাখলে দেশের এই বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি অপূরণীয় আস্থার সংকটে পড়বে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়