News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৪:০৮, ১ জুন ২০২৬

‘আমি শুধু ধর্ষণ করছি, মারছে ডলার’

‘আমি শুধু ধর্ষণ করছি, মারছে ডলার’

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে (৭) ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করেছেন আদালত। এর মধ্য দিয়ে দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলো। 

সোমবার (০১ জুন) বেলা সাড়ে ১০টায় ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন উভয় পক্ষের শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। একই সঙ্গে আদালত মামলার পরবর্তী ধাপ হিসেবে আগামীকাল মঙ্গলবার (২ জুন) থেকে সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেছেন। তবে মামলার এই গুরুত্বপূর্ণ দিনে আদালত প্রাঙ্গণে মূল অপরাধ স্বীকার করলেও হত্যার দায় ‘ডলার’ নামের নতুন এক ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে মামলার গতি ভিন্ন খাতে মোড় নেওয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছে প্রধান আসামি সোহেল রানা।

এদিন সকাল পৌনে ৮টার দিকে কড়া পুলিশি পাহারায় দুই আসামিকে কারাগার থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় এনে রাখা হয়। এর মধ্যে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা করোনাকালীন বা নিয়মিত বন্দি হিসেবে কেরানীগঞ্জ কারাগার থেকে এবং অপরাধে সহায়তাকারী তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালতে নিয়ে আসে পুলিশ। পরবর্তীতে সকাল ১১টার পর তাদের ট্রাইব্যুনালে তোলার সময় আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে চিৎকার করে এক চাঞ্চল্যকর দাবি উত্থাপন করে সোহেল রানা। 

মামলার মূল অপরাধ স্বীকার করলেও হত্যার দায় ‘ডলার’ নামের অন্য এক ব্যক্তির ওপর চাপানোর চেষ্টা করে সে বলে, আমি একা দোষী না, আমার স্ত্রীর কোনো দোষ নেই। সব দোষ ডলারের। আমি ধর্ষণ করছি, মারছে ডলার। ডলার এই কাজের জন্য দুই লাখ টাকা দিছে। 

গণমাধ্যমকর্মীরা এই নতুন নাম আসা ‘ডলার’-এর পরিচয় জানতে চাইলে সোহেল রানা দাবি করে, সে মিরপুর ১১ নম্বর রোডের একটি বাড়ির অনেক টাকাওয়ালা লোক। একই সঙ্গে তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালিয়ে সে অভিযোগ করে, তার কোনো ডিএনএ টেস্ট না করিয়েই তদন্ত প্রতিবেদনে ‘অটোমেটিক’ সব লিখে দেওয়া হয়েছে। যদিও এর আগে আদালতে আসামিরা নিজেদের দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিল, তবে আজ অভিযোগ গঠনের দিনে এসে প্রধান আসামি নতুন করে দায় এড়ানোর এই কৌশল নিলো।

লোমহর্ষক ও নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর দ্রুততম সময়ে তদন্ত শেষ করে গত ২৪ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) অহিদুজ্জামান ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। 

আরও পড়ুন: শিশু রামিসা হত্যা মামলার বিচার শুরু, আসামিরা আদালতে

তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর হত্যার এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে ওই অপরাধে সরাসরি প্রত্যক্ষ সহায়তা করার অভিযোগ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয়েছে। এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে অপরাধ প্রমাণ করতে মোট ১৮ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার দিনই মামলাটি দ্রুত বিচারের স্বার্থে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বদলি করা হয় এবং আদালত আজ চার্জ গঠনের শুনানির দিন নির্ধারণ করেছিলেন। এর মাধ্যমে মামলার প্রাথমিক তদন্ত, ডিএনএ পরীক্ষা, অভিযোগপত্র দাখিল এবং তা আদালতে আমলে নেওয়ার প্রধান চারটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হলো।

মামলার এজাহার ও তদন্তের বিবরণ থেকে জানা যায়, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পল্লবীর নিজ বাসা থেকে বের হয়েছিল পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তার। সে সময় পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আসামি স্বপ্না আক্তার কৌশলে ফুসলিয়ে ফুটফুটে এই শিশুটিকে নিজেদের ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। দীর্ঘ সময় রামিসাকে না পেয়ে তার পরিবার ও প্রতিবেশীরা চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে সন্দেহবশত প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় রামিসার পরিবার স্বপ্নার ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। সেখানে শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাক্ত মরদেহ এবং বাথরুমের ভেতরের একটি বালতি থেকে তার কাটা মাথা উদ্ধার করা হয়। এই রোমহর্ষক ঘটনার পরপরই ঘরের জানালার গ্রিল কেটে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও, প্রযুক্তির সহায়তায় পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

মামলাটির দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের নিযুক্ত আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু বলেন, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মামলাটি যেন অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ হয়, সে বিষয়ে আমি আমার সর্বোচ্চ আইনি দায়িত্ব পালন করব। বাকি সিদ্ধান্ত বিজ্ঞ ট্রাইব্যুনাল আইনের আলোকে গ্রহণ করবেন। 

প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচারের আশ্বাসের বিষয়ে জানতে চাইলে পিপি স্পষ্ট করে বলেন, আমি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে কথা বলছি না। একজন আইনজীবী হিসেবে শুধুমাত্র এই মামলায় নিজের প্রাপ্ত পেশাগত দায়িত্ব শতভাগ পালন করাই আমার লক্ষ্য।

এদিকে মামলার রায় এবং পরবর্তীতে তা দ্রুত কার্যকর করার আইনি জটিলতা নিয়ে ঢাকার জেলা লিগ্যাল এইডের নিয়মিত আইনজীবী রায়হানা নাজনীন জুই তাঁর আইনি বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। 

তিনি বলেন, চলমান পরিস্থিতি ও আদালতের তৎপরতা দেখে মনে হচ্ছে রামিসা হত্যা মামলার রায় খুব দ্রুতই সম্পন্ন হবে। তবে আমাদের বিচারিক ব্যবস্থায় শুধু নিম্ন আদালতে রায় হওয়াই শেষ কথা নয়, সেটি উচ্চ আদালতে কার্যকর করাটাই আসল চ্যালেঞ্জ। সাধারণত এই ধরনের বড় মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি উচ্চ আদালতে গিয়ে দীর্ঘ সময় থমকে থাকে। তবে নিম্ন আদালতের রায়ের পর কারা কর্তৃপক্ষ (জেলার) এবং প্রধান বিচারপতির বিশেষ সদয় হস্তক্ষেপ বা নির্দেশনা পেলে উচ্চ আদালতেও এটি দ্রুত শেষ করা সম্ভব। তা না হলে ডেথ রেফারেন্স সংগ্রহ ও আপিল শুনানির মতো বিভিন্ন আইনি ধাপ শেষ করতে করতে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ বছর লেগে যেতে পারে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়