রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা: সোহেল ও স্বপ্নার বিচার ১ জুন
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে গলা কেটে ও দেহ খণ্ডিত করে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বিচার প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। মামলার দুই আসামি ঘাতক সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমলে নিয়ে আগামী ১ জুন অভিযোগ গঠন (চার্জ ফ্রেম) শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছেন আদালত।
আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নির্ধারিত ওই দিনই আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করার মাধ্যমে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যক্রম শুরু হতে পারে।
রবিবার (২৪ মে) বিকেলে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আসামিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আমলে নিয়ে এই আদেশ প্রদান করেন। এর আগে দুপুরের দিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে এই চার্জশিট দাখিল করেন।
দাখিলকৃত এই চার্জশিটে প্রধান আসামি সোহেল রানার বিরুদ্ধে সরাসরি ধর্ষণ ও নৃসংশ হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে এই বর্বর হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালত দুপুরে চার্জশিটটি গ্রহণ করার পর মামলাটি পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া ও বিচারের জন্য মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বদলির আদেশ দেন এবং এরই ধারাবাহিকতায় বিকেলে ট্রাইব্যুনাল শুনানির নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।
তদন্ত ও মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, নিহত শিশু রামিসা স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে (মঙ্গলবার) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা নিজ ঘর থেকে বাইরে বের হলে প্রতিবেশী আসামি স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে ফুসলিয়ে নিজেদের শয়নকক্ষে ডেকে নিয়ে যায়। এর পর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার স্কুলে যাওয়ার সময় হলে তার মা তাকে ঘরে না পেয়ে চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে নিখোঁজ শিশুটিকে খুঁজতে খুঁজতে আসামিদের ঘরের সামনে গিয়ে রামিসার জুতা দেখতে পান ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা। সন্দেহজনক এই পরিস্থিতিতে আসামিদের ঘরের দরজায় দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকি করলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা মিলে একজোট হয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। ঘরের ভেতরে ঢুকে তারা শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন এবং পাশের একটি বড় বালতির ভেতর থেকে তার খণ্ডিত মাথাটি উদ্ধার করা হয়। এমন ভয়াবহ ও আকস্মিক ঘটনার পর উপস্থিত জনতা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল দিলে পল্লবী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে হত্যাকাণ্ডে সহায়তাকারী স্বপ্না আক্তারকে তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের হেফাজতে নেয়। পরবর্তীতে পুলিশ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে নিবিড় অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সমুখভাগ থেকে প্রধান ঘাতক সোহেল রানাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
আরও পড়ুন: রামিসা হত্যা মামলায় সোহেল-স্বপ্নার বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল
এই নির্মম ও রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পরদিন অর্থাৎ ২০ মে (বুধবার) ভিকটিমের বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে প্রতিবেশী সোহেল রানা, তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার এবং অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তিকে আসামি করে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। গ্রেফতারের পর প্রধান আসামি সোহেল রানাকে আদালতে হাজির করা হলে সে ওইদিনই মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় ভুক্তভোগী শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করে অত্যন্ত লোমহর্ষক ও বিকৃত জবানবন্দি প্রদান করে।
জবানবন্দিতে ঘাতক সোহেল রানা জানায় যে, ঘটনার পূর্বে সে নিষিদ্ধ মাদক ইয়াবা সেবন করেছিল এবং মাদকাসক্ত অবস্থায় সে এই বিকৃত ও নৃশংস যৌনকর্মে লিপ্ত হয়।
সোহেল রানা তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ঘটনার বিশদ বিবরণ দিয়ে আদালতকে জানায়, ১৯ মে সকালে রামিসা ঘর থেকে বের হওয়ার পর তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে তাদের ঘরে নিয়ে আসে। এরপর সোহেল রানা শিশুটিকে বাথরুমে নিয়ে পাশবিকভাবে ধর্ষণ করলে যন্ত্রণায় রামিসা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ঠিক এই সময় বাইরে থেকে রামিসার মা নিখোঁজ সন্তানের খোঁজে আসামিদের দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করেন। দরজার আওয়াজ শুনে এবং ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে সোহেল রানা বাথরুমের ভেতরেই ধারালো ছুরি দিয়ে রামিসার গলা কেটে তাকে হত্যা করে। এরপর নৃশংসতার চরম সীমায় গিয়ে মরদেহটি পুরোপুরি গুম করার উদ্দেশ্যে সে ধারালো ছুরি দিয়ে রামিসার মাথাটি কেটে ধড় থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেলে এবং দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে দেয়। শুধু তাই নয়, ঘাতক সোহেল ক্ষিপ্ত হয়ে ছুরি দিয়ে শিশুটির যৌনাঙ্গ পর্যন্ত ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। এই সমস্ত বীভৎস কর্মকাণ্ডের সময় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার একই রুমের ভেতরে উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সোহেল রানা ঘরের জানালার গ্রিল কেটে ফুতুল্লার দিকে পালিয়ে যায়।
আদালতকে ঘাতক সোহেল রানা আরও জানায় যে, মাদকাসক্ত হয়ে সে এই বর্বর হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবারের সঙ্গে তাদের পূর্ব শত্রুতা বা কোনো ধরনের ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল না।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








