নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১২:০১, ৭ জুন ২০২৬
আপডেট: ১২:৫৮, ৭ জুন ২০২৬

শিশু রামিসা হত্যা মামলার ঐতিহাসিক রায়: সোহেল ও স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ড

শিশু রামিসা হত্যা মামলার ঐতিহাসিক রায়: সোহেল ও স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ড

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার চাঞ্চল্যকর মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা (৩০) ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ওরফে স্বপ্না খাতুনকে (২৬) মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে আদালত তাদের প্রত্যেককে ৫ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড বা জরিমানার আদেশ দিয়েছেন। 

রবিবার (০৭ জুন) বেলা ১১টা ৩৭ মিনিটে ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন জনাকীর্ণ আদালতে আসামিদের উপস্থিতিতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। 

দেশের বিচারিক ইতিহাসে এটিই প্রথম কোনো ধর্ষণ ও হত্যা মামলা, যার সমগ্র বিচারিক প্রক্রিয়া মাত্র চার কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করে রায় ঘোষণা করা হলো। চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায়কে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই আদালত পাড়ায় অতিরিক্ত পুলিশ ও সাদা পোশাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সমন্বয়ে নজিরবিহীন ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

মামলার বিবরণী ও আদালত সূত্রে জানা যায়, নিহত রামিসা আক্তার পল্লবীর পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে নিজের ঘর থেকে বের হলে প্রতিবেশী সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে তাদের ফ্ল্যাটে ডেকে নিয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার মা তাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে ভবনের তৃতীয় তলার ওই ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে রামিসার জুতা দেখতে পেয়ে তিনি ডাকাডাকি করেন। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং ভবনের অন্যান্য বাসিন্দারা মিলে জোরপূর্বক দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাক্ত মরদেহ এবং পাশের একটি বড় বালতির ভেতর তার বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পান তারা।

হত্যাকাণ্ডের পরপরই স্থানীয়রা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশকে অবহিত করলে পল্লবী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঘরের ভেতর আটকে থাকা স্বপ্না খাতুনকে হেফাজতে নেয়। তবে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা ততক্ষণে ঘরের গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার মাত্র ৭ ঘণ্টার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে সোহেল রানাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। এই নৃশংস ঘটনার পরদিন, ২০ মে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে আসামি করে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

গ্রেফতারের পর ২০ মে মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনায়েদের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে অত্যন্ত লোমহর্ষক ও পুঙ্খানুপুঙ্খ জবানবন্দি দেয়। 

জবানবন্দিতে সোহেল জানায়, সে নিয়মিত মাদক সেবন করত। ঘটনার দিন সকালে পাশের ফ্ল্যাটের লোকজন বের হয়ে গেলে ৮ বছরের শিশু রামিসাকে একা পেয়ে সে নিজের বাথরুমে টেনে নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা করে। শিশুটি চিৎকার করতে চাইলে সে ওড়না দিয়ে মুখ বেঁধে তাকে ধর্ষণ করে। একপর্যায়ে শিশুটি অজ্ঞান হয়ে গেলে তাকে মৃত ভেবে প্রমাণ লোপাট ও লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে ছুরি এনে তার মাথা কেটে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে। পরবর্তীতে হাত কাটার চেষ্টা করার সময় বাইরে রামিসার মায়ের কণ্ঠ ও ডাকাডাকি শুনে সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং স্লাইড রেঞ্জ দিয়ে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়।

বিচারিক প্রক্রিয়ার চার্জগঠনের দিন সোহেল ‘ডলার’ নামের অন্য এক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার দাবি করলেও রাষ্ট্রপক্ষ ও তদন্ত কর্মকর্তার অনুসন্ধানে অন্য কারও উপস্থিতির প্রমাণ মেলেনি। 

৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে সোহেল বিজ্ঞ আদালতের উদ্দেশ্যে বলেন, আমিও দোষ করছি, ডলারও দোষ করছে স্যার। ওরে ধরেন স্যার। আমার একটা ছাওয়াল আছে, আমাকে মাফ করে দেন। একই সাথে সে তার স্ত্রীকে নির্দোষ দাবি করার চেষ্টা করে। 

অন্যদিকে, স্ত্রী স্বপ্না আক্তার আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও দরজা না খোলার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।

আরও পড়ুন: রায় ঘিরে পল্লবী শিশু ধর্ষণ-হত্যা মামলায় আদালতে আসামি হাজির

পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে ঘটনার মাত্র ৫ দিনের মাথায়, গত ২৪ মে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। ওই দিনই মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। তবে পবিত্র ঈদুল আজহার অবকাশকালীন ছুটি থাকায় ১ জুন মামলার চার্জ গঠন করে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। বিচারিক আদালতগুলোতে সাধারণ ছুটি সচল থাকলেও এই চাঞ্চল্যকর মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ট্রাইব্যুনালের ছুটি বিশেষ আদেশে বাতিল করা হয়েছিল।

১ জুন অভিযোগ গঠনের পর ২ জুন শুরু হয় নজিরবিহীন দ্রুততার সাথে সাক্ষ্যগ্রহণ। ওই দিন সকাল থেকে গভীর মনোযোগের সাথে আদালত এই মামলার মোট ১৭ জন নিবন্ধিত সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের জবানবন্দি ও সাক্ষ্য রেকর্ড করেন। সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা, মা পারভীন আক্তার, বড় বোন রাইসা আক্তার, ফুপু মাহমুদা আক্তার, চাচা মিজানুর রহমান লিটন, ভবনের অন্যান্য তলার বাসিন্দা ও প্রতিবেশী মনির হোসেন, জাকিরুল ইসলাম রাজু, শেখ আবু সামা, ফুপা মনিরুজ্জামান শাহীন, কনস্টেবল রোমা আক্তার, কনস্টেবল শরীফ মিয়া, সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী এসআই ইকবাল হোসেন, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. নাসাদ জাবিন, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডকারী ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ, এসআই রাশেদুল ইসলাম এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই অহিদুজ্জামান। ৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং ৪ জুন রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের সমাপনী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত আজ ৭ জুন রায়ের দিন ধার্য করেন।

আজ সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কঠোর পুলিশি পাহারায় আসামি স্বপ্না আক্তারকে এবং ৮টা ৫০ মিনিটে প্রিজনভ্যানে করে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় আনা হয়। এরপর ১০টা ৪৫ মিনিটে সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় মাথায় হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে সোহেলকে ট্রাইব্যুনালের এজলাসে তোলা হয়। বেলা ১১টায় বিজ্ঞ বিচারক মাসরুর সালেকীন রায়ের মূল অংশ ও পর্যবেক্ষণ পড়া শুরু করেন।

বিজ্ঞ বিচারক তার রায়ের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, চিকিৎসা শাস্ত্রের সনদ, ভিডিও ফুটেজ, উদ্ধারকৃত রক্তমাখা আলামত এবং আসামির ১৬৪ ধারার জবানবন্দির মাধ্যমে এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, সোহেল রানা শিশু রামিসাকে হত্যার পূর্বে ধর্ষণ করেছিল। আসামির এই স্বীকারোক্তি পরবর্তীতে প্রত্যাহারের কোনো আবেদনও করা হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু আদালতে যুক্তিতর্ক দিয়ে প্রমাণ করেন যে, সোহেল রানা যখন এই নৃশংস অপরাধ সংঘটন করছিল এবং পরবর্তীতে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে পালিয়ে যাচ্ছিল, তখন তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে সম্পূর্ণ সজ্ঞানতায় পালাতে ও তথ্য গোপন করতে সরাসরি সহায়তা প্রদান করে।

যদিও আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহ যুক্তি দিয়েছিলেন যে, সোহেল রানা ঘটনার সময় চরমভাবে নেশাগ্রস্ত ছিল বিধায় তার মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন দেওয়া হোক এবং স্বপ্না আক্তারকে শুধু লাশ গুমের সহায়তার অপরাধে (২০১ ধারা) লঘুদণ্ড দেওয়া হোক, আদালত সেই যুক্তি খারিজ করে দেন। 

আদালত রায়ে স্পষ্ট করেন, স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই একই অপরাধের সমকক্ষ অংশীদার এবং তাদের অপরাধের ভয়াবহতা ও নিষ্ঠুরতা বিবেচনা করে সমাজ থেকে এই ধরনের অপরাধ নির্মূলে সর্বোচ্চ শাস্তিই একমাত্র দৃষ্টান্ত। ফলশ্রুতিতে, বিজ্ঞ আদালত প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন উভয়কেই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার আদেশ দিয়ে এই ঐতিহাসিক মামলার রায় সমাপ্ত করেন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়