রামিসা ধর্ষণ-হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স নথি হাইকোর্টে
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় বিচারিক আদালতের দেওয়া ফাঁসির রায় কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মামলার দুই প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্সের (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) প্রয়োজনীয় নথিপত্র উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (০৯ জুন) বিকেল ৪টার দিকে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন পূর্ণাঙ্গ রায়ের ৭২ পৃষ্ঠার মূল কপিসহ সংশ্লিষ্ট মামলার যাবতীয় নথি ও বিবরণী সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে পাঠান।
দেশের ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, নিম্ন আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ডের সাজা হলে তা কার্যকর করার পূর্বে হাইকোর্টের বাধ্যতামূলক অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে, যা বিচারিক পরিমণ্ডলে ‘ডেথ রেফারেন্স’ মামলা হিসেবে গণ্য করা হয়। এখন হাইকোর্ট বিভাগে এই ডেথ রেফারেন্সের ওপর বিস্তারিত শুনানি অনুষ্ঠিত হবে এবং উচ্চ আদালতই আসামিদের ফাঁসি বহাল রাখা, পরিবর্তন বা বাতিল করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।
এর আগে, গত ৭ জুন (রবিবার) ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় সাজাপ্রাপ্ত দুই আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তার (আদালতের নথিতে স্বপ্না খাতুনও উল্লেখ রয়েছে) কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে উভয় আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। রায় ঘোষণার পরপরই কঠোর নিরাপত্তায় সাজাপ্রাপ্তদের আদালতের এজলাস থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে (মৃত্যুকূপ) স্থানান্তর করা হয়।
মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আদালত প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
রায়ের বিশেষ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এই জরিমানার সম্পূর্ণ অর্থ ভুক্তভোগী শিশু রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারী বা তার পরিবার পাবেন। যদি আসামিপক্ষ এই অর্থদণ্ড পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের মালিকানাধীন স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি সরকারিভাবে নিলামে বিক্রি করে সেই অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে রামিসার পরিবারকে দেওয়ার স্পষ্ট আদেশ দিয়েছেন আদালত।
আরও পড়ুন: শিশু রামিসা হত্যা মামলার ঐতিহাসিক রায়: সোহেল ও স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ড
আদালতের লিখিত পর্যবেক্ষণে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ চিত্র ও অপরাধীদের সম্পৃক্ততার অকাট্য প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে।
বিচারক তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসাকে হত্যার পূর্বে অত্যন্ত পাশবিকভাবে ধর্ষণ করা হয়েছিল এবং ময়নাতদন্তসহ ডাক্তারি পরীক্ষায় তার শরীরের বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থানে গুরুতর জখম ও আঘাতের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে।
প্রধান আসামি সোহেল রানার বিষয়ে আদালত বলেন, গ্রেফতারের পর সে আদালতে স্বেচ্ছায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছিল। পরবর্তীতে আইনগতভাবে সেই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রত্যাহারের কোনো আবেদন বা উদ্যোগ আসামিপক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি, যা প্রমাণ করে সোহেল রানা সম্পূর্ণ সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় নিজের দোষ স্বীকার করেছে।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় আসামি ও সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্নার বিষয়ে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, ঘরে এত বড় অপরাধ সংঘটিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি তা প্রতিরোধে কোনো ভূমিকা রাখেননি। উল্টো অপরাধ ধামাচাপা দিতে এবং নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর তার স্বামীকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যেতে সরাসরি সহায়তা করেছিলেন। অপরাধে এই পরোক্ষ অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতার দায় প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাকেও সমপরিমাণ সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় এনেছেন।
এই মামলাটি দেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে দ্রুততম সময়ে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার একটি অনন্য ও উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। গত ১৯ মে সকালে পল্লবীর নিজ বাসা থেকে নিখোঁজ হয় দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তার। পরিবারের দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর স্থানীয় একটি ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় পল্লবী থানায় মামলা দায়েরের পর পুলিশ আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তায় পলাতক প্রধান আসামিকে গ্রেফতার করে এবং অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করে। এরপর আদালতে অভিযোগ গঠন, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ, আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং উভয় পক্ষের আইনি যুক্তিতর্ক উপস্থাপনসহ যাবতীয় বিচারিক আনুষ্ঠানিকতা মাত্র চার কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করা হয়। মামলায় মোট ১৮ জন সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরা অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করে আদালত রায়ের জন্য দিন ধার্য করেছিলেন। দীর্ঘসূত্রতার চেনা ছক ভেঙে এত দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়ায় বিষয়টি সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।
এদিকে মামলার সংবেদনশীলতা ও জনঅসন্তোষের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রায় ঘোষণার দিন আদালত পাড়ায় নজিরবিহীন ও বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। ট্রাইব্যুনাল ভবন ও এর আশপাশের এলাকায় বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করার পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সাদা পোশাকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়, যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হতে পারে। দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক সাজার এই রায়কে সাধারণ মানুষ স্বাগত জানালেও এখন সবার নজর হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শুনানির দিকে, যেখানে নির্ধারিত হবে এই দুই আসামির চূড়ান্ত ভাগ্য।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








