নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৩:৪৮, ৭ জুন ২০২৬

রামিসা হত্যা মামলার রায় বহালের আশা আইনমন্ত্রীর

রামিসা হত্যা মামলার রায় বহালের আশা আইনমন্ত্রীর

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর পৈশাচিক উপায়ে গলা কেটে হত্যার আলোচিত মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। এই অর্থদণ্ডের পুরো টাকা ভুক্তভোগী শিশু রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারী হিসেবে তার মা-বাবা পাবেন। আসামিরা এই ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যর্থ হলে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে রামিসার পরিবারকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় এবং আদালত খোলার পর মাত্র ৬ কার্যদিবসের মধ্যে ঘোষিত এই রায়কে বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন, ঐতিহাসিক ও দ্রুততম দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

রবিবার (০৭ জুন) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আসামিদের উপস্থিতিতে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। এদিন বেলা ১১টার পর বিচারক এজলাসে রায় পড়া শুরু করেন। 

রায় পাঠকালে অত্যন্ত আবেগঘন পর্যবেক্ষণে বিচারক মাসরুর সালেকীন বলেন, ধর্ষণ শুধু একটি পরিবার নয়, বরং পুরো সমাজের হৃদয়কে ব্যথিত করে। 

তিনি রায়ে উল্লেখ করেন, মামলার সুরতহাল রিপোর্টে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, শিশু রামিসাকে হত্যার আগে নির্মমভাবে ধর্ষণ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে প্রধান আসামি সোহেল রানার দেওয়া ১৬৪ ধারার অপরাধ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও আদালতে সম্পূর্ণরূপে প্রমাণিত হয়েছে। অন্য আসামি, সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ঘটনার পর সোহেলকে পালাতে এবং অপরাধ আড়াল করতে সহায়তার জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়। 

বিচারক স্পষ্ট করে বলেন, আসামিদের এই জঘন্য অপরাধ কোনোভাবেই সংশোধনযোগ্য নয় এবং এমন অপরাধে যথাযথ শাস্তি না দিলে সমাজে ন্যায়বিচার পুরোপুরি ব্যর্থ হবে। তাই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(২) ধারায় আসামিদের এই সর্বোচ্চ সাজা প্রদান করা হয়েছে। এর আগে কড়া নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রথমে স্বপ্নাকে এবং ৮টা ৫০ মিনিটে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানাকে কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে ঢাকার আদালতে আনা হয় এবং রায় ঘোষণার আগে তাদের কাঠগড়ায় তোলা হয়।

নথি ও মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, নিহত রামিসা আক্তার স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকালে সে ঘর থেকে বের হলে আসামি স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে নিজেদের কক্ষে ডেকে নিয়ে যান। পরে সেখানে রামিসাকে ধর্ষণের পর পৈশাচিক উপায়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। দীর্ঘ সময় মেয়ের খোঁজ না পেয়ে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে আসামিদের ঘরের সামনে রামিসার জুতা দেখতে পান তার মা। ডাকাডাকিতে কোনো সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা ভেঙে ঘরের ভেতর থেকে রামিসার খণ্ডিত ও রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশকে অবহিত করা হলে পুলিশ এসে ঘটনাস্থল থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় অভিযান চালিয়ে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এই নির্মম ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২০ মে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন, যা দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত শেষে রেকর্ড গড়ে মাত্র ৫ দিনের মাথায় অর্থাৎ ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছিল পুলিশ। এরপর ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনালে মোট ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ ও উভয় পক্ষের দীর্ঘ যুক্তিতর্ক শেষে ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় আজ এই মামলার চূড়ান্ত রায় দেওয়া হলো। 

আরও পড়ুন: ‘প্রত্যাশিত রায় পেয়েছি, এখন দ্রুত কার্যকর দেখতে চাই’

এই দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার পটভূমি ব্যাখ্যা করে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান জানান, ১৯ মে ঘটনার পর ২৪ মে’র মধ্যে পুলিশ চার্জশিট জমা দিলেও ২৫ মে থেকে ৩১ মে অবধি সরকারি ছুটি ছিল। এমনকি নিম্ন আদালতগুলো সাধারণত ১ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত দীর্ঘ ছুটির আওতায় থাকে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক মাসের মধ্যে এই স্পর্শকাতর বিচারকার্য শেষ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করায় নিম্ন আদালতের ছুটি বাতিলের একটি বিশেষ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তীতে মাননীয় প্রধান বিচারপতি সম্মতি দেন যে দেশের শিশু ট্রাইব্যুনালগুলো এই ছুটির আওতামুক্ত থাকবে। এর ফলেই সিএমএম কোর্ট থেকে দ্রুত চার্জশিট ট্রাইব্যুনালে পাঠানো সম্ভব হয় এবং ১ জুন চার্জ গঠনের পর মাত্র ৬ কার্যদিবসের মধ্যে সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্ক শেষ করে এই বেদনাদায়ক ঘটনার বিচার সম্পন্ন করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে বিরল। উপমহাদেশে অতীতে ভারতের নদীয়ায় একবার এমন একটি ঘটনার বিচারকার্য মাত্র এক দিনে শেষ করার নজির রয়েছে।

এদিকে রায় ঘোষণার পর দুপুরে সচিবালয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আইনি প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পার করেই রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে। এই ঘোষিত শাস্তিতে আমরা আপাতত সন্তুষ্ট এবং আশা করি উচ্চ আদালতেও এই রায় বহাল থাকবে। 

রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি জানান, আইনের নির্ধারিত স্তরগুলো অতিক্রম না করে তাড়াহুড়ো করে রায় কার্যকর করতে গেলে তা নিয়ে সুশাসন ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্ন উঠবে। তাই দোষী পক্ষ যদি উচ্চ আদালতে আপিল করতে চায়, সেখানেও সরকার আইনি ধাপ অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেবে। আগামী সাত দিনের মধ্যে এই মামলার সমস্ত ফাইল হাইকোর্ট বিভাগে চলে যাবে এবং সুপ্রিম কোর্টের সরাসরি তত্ত্বাবধানে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে পেপারবুক প্রস্তুত করা হবে। 

আইনমন্ত্রী আরও বলেন, রামিসার এই ঘটনায় পুরো জাতি বেদনাহত ছিল। আমরা রামিসাকে তার বাবা-মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিতে পারব না, কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের যতটুকু দায়িত্ব তা আমরা সর্বোচ্চ গতিতে করার চেষ্টা করেছি। আমি অতীতে অ্যাটর্নি জেনারেল থাকা অবস্থায় প্রধান বিচারপতির আদেশে মেজর সিনহা হত্যা মামলা ও বুয়েটের আবরার ফাহাদ হত্যা মামলা অত্যন্ত দ্রুত নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয়েছিলাম। রামিসার মামলার বিষয়েও আমি ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা বলেছি, তিনি এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নেবেন। সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে আগামী তিন মাসের মধ্যে এই রায় কার্যকর করা সম্ভব হবে। 

সমাজে এমন অপরাধ বাড়ার পেছনে বিচারহীনতা বা দীর্ঘসূত্রতা অন্যতম কারণ হতে পারে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, প্রধান আসামি সোহেল রানা ছিল মানসিকভাবে চরম অপরাধী। সে বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে এবং জনমন থেকে ঘটনাটি ভুলিয়ে দিতে মামলার রেকর্ডে নেই এমন আরেকজন নির্দোষ ব্যক্তিকে এই মামলায় টেনে আনার অপচেষ্টা করেছিল, কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ বিচারে সম্পূর্ণ ফোকাসড ছিল। এখন থেকে রামিসা, আছিয়া, রাজন, রাকিবসহ সব স্পর্শকাতর ও আলোচিত শিশু হত্যা ও সহিংসতার মামলাগুলো উচ্চ আদালতে দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ রাজনৈতিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রের সব যন্ত্র ও বিভাগ অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কাজ করায় এই ঐতিহাসিক বিচার এত দ্রুত সম্ভব হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস কাজল। 

দুপুরে সুপ্রিম কোর্টে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ডের রায় দেশের বিচারিক প্রক্রিয়ার ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এত কম সময়ে বিচার সম্পন্ন করে রাষ্ট্র তার সুশাসন ও ন্যায়বিচারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করেছে। 

তিনি সুপ্রিম কোর্টের সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করে বলেন, রামিসা হত্যা মামলার রায়ের আনুষ্ঠানিক রেকর্ড হাতে পাওয়ার পরপরই হাইকোর্ট বিভাগে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলার শুনানি ও আপিল নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং মাননীয় প্রধান বিচারপতি এই বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।

সর্বোচ্চ আদালতের এই ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহত রামিসার বাবা এবং মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা।

তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের বলেন, আদালতের এই রায়ে আমরা আপাতত সন্তুষ্ট। আমাদের কলিজার টুকরো রামিসা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না, কিন্তু এই নরপশুদের ফাঁসির রায় যেন উচ্চ আদালতেও বহাল থাকে এবং তা যেন অত্যন্ত দ্রুত কার্যকর করা হয়। আমি চাই না আর কোনো বাবার বুক এভাবে খালি হোক। 

দেশের বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, এই রায় কার্যকর হলে তা দেশের শিশু নির্যাতন ও সহিংসতা দমনে একটি কঠোর দৃষ্টান্ত ও অপরাধীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়