রামিসা ধর্ষণ-হত্যা মামলায় আদালতে আসামি হাজির
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর বর্বরোচিতভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী মামলার রায় আজ রবিবার (০৭ জুন) ঘোষণা করা হচ্ছে। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে বেলা ১১টার দিকে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণার কথা রয়েছে। তদন্ত শুরু থেকে রায় ঘোষণার পর্যায় পর্যন্ত মাত্র ১৭ দিন এবং ট্রাইব্যুনালের মূল বিচারিক প্রক্রিয়া মাত্র চার কার্যদিবসে সম্পন্ন হওয়ায় এই মামলাটি দেশের বিচারিক ইতিহাসে অন্যতম দ্রুততম ও বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বহুল আলোচিত এই রায়কে কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগর আদালত প্রাঙ্গণ ও এর আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও সাদা পোশাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের মোতায়েন করে কঠোর ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
এরই মধ্যে আজ সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মামলার দ্বিতীয় আসামি ও প্রধান অভিযুক্তের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার এবং সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানাকে কঠোর পুলিশি পাহারায় আদালত প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হয়। রায় ঘোষণার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত আদালতের হাজতখানায় তাদের বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে। গত ১৯ মে পল্লবীর একটি আবাসিক ভবনে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসাকে নৃশংসভাবে হত্যার পর থেকেই দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ, শোক ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণের সুনির্দিষ্ট আশ্বাস প্রদান করা হয়েছিল।
মামলার এজাহার ও বিবরণী থেকে জানা যায়, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পল্লবীর নিজ বাসা থেকে বের হয়েছিল আট বছরের শিশু রামিসা আক্তার। এ সময় তাদের প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া স্বপ্না আক্তার কৌশলে রামিসাকে ডেকে নিজের শয়নকক্ষে নিয়ে যান। পরবর্তীতে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর উদ্দেশ্যে তার মা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে ভবনের অন্য একটি ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল রানার বন্ধ দরজার সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পেয়ে মায়ের মনে তীব্র সন্দেহের উদ্রেক হয়। রামিসার মা-বাবার উপর্যুপরি ডাকাডাকিতেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে একপর্যায়ে ভবনের অন্যান্য বাসিন্দা ও প্রতিবেশীদের সহায়তায় ঘরের দরজা ভেঙে তারা ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং কক্ষের ভেতরে থাকা একটি বড় বালতির মধ্য থেকে তার বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার করা হয়। এই লোমহর্ষক ঘটনাটি জানাজানি হলে তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশকে অবহিত করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্বপ্না আক্তারকে নিজেদের হেফাজতে নেয় এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার দিনই নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানা এলাকা থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এই নৃশংস ঘটনার পরদিন, অর্থাৎ ২০ মে নিহত শিশুর পিতা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসহ দণ্ডবিধির ৩০২ ও ২০১ ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
আরও পড়ুন: বোনের কাটা মাথা দেখে চিৎকার করে বেরিয়ে আসে রাইসা
মামলা দায়েরের পর থেকেই আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা অত্যন্ত তৎপরতার সাথে ডিএনএ ও ফরেনসিক আলামত, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন বস্তুগত প্রমাণ দ্রুততার সাথে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ শুরু করে। অপরাধের সুনির্দিষ্ট ও বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ নিশ্চিত করে মামলা দায়েরের মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়, গত ২৪ মে আদালতে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। অভিযোগপত্রে প্রধান আসামি সোহেল রানার বিরুদ্ধে সরাসরি ধর্ষণ ও হত্যার এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনে সরাসরি সহযোগিতা ও লাশ গুমের চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। এরপর আদালত চার্জশিটটি গ্রহণ করে দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে মামলাটি ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনাল গত ১ জুন দুই আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। পরদিন ২ জুন রাষ্ট্রপক্ষের মোট ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ভুক্তভোগী শিশুর পিতা-মাতা, বড় বোন, প্রতিবেশী, ঘটনার রাতে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্য, তদন্ত কর্মকর্তা এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের সহ ১৬ জনের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করা হয়। এরপর ৩ জুন ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি অনুষ্ঠিত হলে সোহেল ও স্বপ্না উভয়ই নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেন, যদিও প্রধান আসামি সোহেল রানা একই সাথে আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
গত ৪ জুন মামলার রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যকার চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু ট্রাইব্যুনালকে অবহিত করেন যে, সংগৃহীত ফরেনসিক আলামত, ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এবং পারিপার্শ্বিক সমস্ত প্রমাণাদির মাধ্যমে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় একটি নিখুঁত ‘চেইন অব ফ্যাক্ট’ বা ঘটনার ধারাবাহিক সূত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যা আসামিদের অপরাধের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত করে। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সমাজের অবক্ষয় রোধ এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে দুই আসামিরই সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড দাবি করা হয়।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োজিত আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ যুক্তিতে দাবি করেন যে, মামলায় কিছু টেকনিক্যাল ও প্রক্রিয়াগত ঘাটতি রয়েছে। তিনি আদালতে ডিএনএ প্রতিবেদনের প্রাসঙ্গিকতা, আসামিকে ঘটনাস্থল থেকে সরাসরি গ্রেপ্তার না করা এবং সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ না করার বিষয়টি তুলে ধরে আসামিদের খালাস প্রার্থনা করেন। তবে বিকল্প প্রার্থনা হিসেবে তিনি প্রধান আসামি সোহেল রানার জন্য মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে লাশ গুমে সহযোগিতার অভিযোগে সর্বোচ্চ সাত বছরের সাজার আবেদন জানান।
উভয়পক্ষের দীর্ঘ শুনানি ও আইনি পর্যালোচনা শেষে আদালত আজ ৭ জুন রায়ের জন্য দিন ধার্য করেন। রায় ঘোষণার আগের দিন শনিবার আয়োজিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে নিহত রামিসার পিতা আব্দুল হান্নান মোল্লা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, তিনি কেবল তার নিজের সন্তান হত্যার বিচার চান না, বরং এমন একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থা ও নিরাপদ সমাজ দেখতে চান যেখানে আর কোনো নিষ্পাপ শিশুকে এমন নির্মম ও পাশবিক নির্যাতনের শিকার হতে না হয়। দেশের ইতিহাসে অন্যতম দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন হওয়া এই মামলার রায়ের মাধ্যমে আজ নির্ধারিত হবে দুই আসামির চূড়ান্ত আইনি ভাগ্য, যা দেশের শিশু নির্যাতন ও সহিংসতা বিরোধী বিচারিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনজ্ঞরা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








