সাংবাদিকদের নিরাপত্তায় কঠোর অবস্থানে সরকার
তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। ফাইল ছবি
পবিত্র ঈদুল আজহার টানা সাত দিনের দীর্ঘ ছুটি শেষে আজ সোমবার থেকে খুলেছে সরকারি অফিস-আদালত। তবে ঈদের পর প্রথম কর্মদিবসে বাংলাদেশ সচিবালয়ে এখনো পুরোপুরি কর্মচাঞ্চল্য ফেরেনি।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, খাদ্য, বাণিজ্য, স্বাস্থ্য এবং গৃহায়ন ও গণপূর্তসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ঘুরে দেখা গেছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশ এখনো ছুটিতে রয়েছেন। ফলে অনেক কক্ষেই নির্ধারিত আসনের বিপরীতে উপস্থিতি ছিল বেশ কম। প্রথম দিনে দাপ্তরিক কাজের চেয়ে দীর্ঘ ছুটির পর সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা হওয়া, ঈদের শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় এবং কোলাকুলিতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন উপস্থিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তবে আমলতান্ত্রিক এই শৈথিল্যের মধ্যেই সকাল ৯টার কিছু পরে সচিবালয়ে প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
একই সঙ্গে সকালেই নিজ নিজ দপ্তরে কাজে যোগ দেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীসহ সরকারের বেশ কয়েকজন নীতিপ্রাধান্য ব্যক্তি।
ঈদোত্তর প্রথম কর্মদিবসে সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সরকারের নীতিগত অবস্থান ও সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। গত ৩১ মে (রবিবার) রাতে আকস্মিকভাবে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট জনঅস্বস্তি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, শুধুমাত্র সাময়িক 'জনতুষ্টিবাদী' সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সরকারের কাজ নয়; দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি রক্ষা এবং সুশাসন বজায় রাখাই এই সরকারের মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশ মূলত জ্বালানি খাতে একটি আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের চলমান সংকটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত এই মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে। বিশ্ববাজারে সংকটের শুরুতেই অন্যান্য দেশগুলো দাম বাড়িয়ে দিলেও বাংলাদেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে এতদিন আগের দামেই তেল সরবরাহ বজায় রেখেছিল। তবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা, আমদানি ব্যয় এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলার বিষয়টি মাথায় রেখে অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ বিশেষজ্ঞ পরামর্শক কমিটির সুপারিশ ও সুনির্দিষ্ট মূল্যায়নের ভিত্তিতেই সরকার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ফ্যাসিবাদের পতনের পর ঢালাওভাবে দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমার বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করেন তথ্যমন্ত্রী।
তিনি স্বীকার করেন যে, গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে ক্ষোভ-বিক্ষোভ এবং ভিকটিমদের আবেগ থেকে দেশজুড়ে চারিদিকে প্রচুর মামলা হচ্ছে। তবে নতুন সরকার হিসেবে এই মামলাগুলোর আইনি সত্যতা ও গভীরতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, অকাট্য তথ্য-প্রমাণ ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কোনো মূলধারার সাংবাদিক বা নাগরিককে মিথ্যা মামলায় হয়রানি বা হেনস্তার শিকার হতে দেওয়া হবে না। অপরাধের সুনির্দিষ্ট ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য থাকলে তবেই দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিচারপ্রক্রিয়া চলবে, অন্যথায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক কোনো মামলাকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
সাক্ষাৎকারকালে রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের অভ্যন্তরে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে মূলধারার বেশ কয়েকজন সংবাদকর্মীর ওপর নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বর্বরোচিত হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান তথ্যমন্ত্রী।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা অত্যন্ত দুঃখজনক। গণমাধ্যমের প্রধান কাজই হচ্ছে সমাজের সব ক্ষেত্রকে জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে ফুটিয়ে তোলা এবং এই অর্পিত দায়িত্ব পালনে গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতা করা রাষ্ট্র ও সমাজের সবার যৌথ দায়িত্ব।
বিশেষ করে টেলিভিশন ও লাইভ মিডিয়ার পেশাদারিত্বের প্রশংসা করে তিনি বলেন, সরাসরি বা লাইভ সম্প্রচারে তথ্য বিকৃতির সুযোগ থাকে না, যা সমাজে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরাসরি ভূমিকা রাখে। এই হামলার ঘটনাটি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে এবং এ বিষয়ে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও দ্রুত আলোচনা করবেন। মূলধারার সাংবাদিকদের ওপর যেকোনো ধরনের অনৈতিক বাধা বা হস্তক্ষেপ মোকাবিলায় বর্তমান সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি অবলম্বন করবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রমে মূলধারার গণমাধ্যমের ইতিবাচক, গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল ভূমিকার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তথ্যমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, ঈদুল ফিতর, পহেলা বৈশাখ এবং সদ্য সমাপ্ত ঈদুল আজহার মতো বড় বড় জাতীয় উৎসবগুলো অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে উদযাপিত হয়েছে এবং দেশের কোথাও কোনো উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক ঘটনা ঘটেনি।
সম্প্রতি মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক, মালিকপক্ষ ও সাংবাদিক নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন যে, তারা বর্তমানে কোনো প্রকার সরকারি নিয়ন্ত্রণ বা অদৃশ্য চাপ ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে পেশাচর্চা করছেন। সরকার অবাধ ও স্বাধীন সাংবাদিকতাকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ মনে করে এবং সংবাদকর্মীরা যেন নির্ভয়ে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাবে। পরিশেষে, পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের সমগ্র গণমাধ্যমকর্মী এবং দেশবাসীকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








