News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১২:০৮, ১ জুন ২০২৬

লিবিয়া থেকে ফিরলেন ১৭৪ বাংলাদেশি

লিবিয়া থেকে ফিরলেন ১৭৪ বাংলাদেশি

ছবি: সংগৃহীত

আফ্রিকার দেশ লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলীর কুখ্যাত ‘তাজুরা ডিটেনশন সেন্টার’ (আটক শিবির) থেকে অবশেষে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরেছেন ১৭৪ জন বাংলাদেশি নাগরিক। লিবিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের নিরলস কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সক্রিয় সহযোগিতায় এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়। 

সোমবার (০১ জুন) সকালে বুরাক এয়ারের বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে তারা ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। ফেরত আসা এই অভিবাসীদের মধ্যে ১৪ জন গুরুতর শারীরিকভাবে অসুস্থ বলে জানা গেছে, যাদের বিমানবন্দরেই প্রাথমিক জরুরি চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হয়। এর আগে, গত রবিবার লিবিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এক বিবৃতির মাধ্যমে এই বাংলাদেশিদের স্বদেশে নিরাপদে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল।

প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চলাকালীন লিবিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ডিটেনশন সেন্টারে গিয়ে সরাসরি ভুক্তভোগী অভিবাসীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন। এ সময় মুক্ত হওয়া বাংলাদেশিরা লিবিয়ায় মানবপাচারের শিকার হওয়ার অত্যন্ত করুণ ও লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রদূতের সামনে তুলে ধরেন। 

তারা জানান, দেশের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক দালালচক্রের চোখ ধাঁধানো প্রলোভনে পড়ে উন্নত জীবনের আশায় তারা সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশ্যে লিবিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নেয়। সেখানে তারা বিভিন্ন সশস্ত্র মানবপাচারকারী ও আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েন। অপরাধীরা তাদের আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যযুগীয় কায়দায় অনবরত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। এই মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক পরিবারকে দেশে তাদের শেষ সম্বল জমি-জমা, ভিটেমাটি বিক্রি করে সম্পূর্ণ সর্বস্বান্ত হতে হয়েছে।

আরও পড়ুন: মাত্র ২ কর্মদিবসে মার্কিন অভিবাসী ভিসা দেবে ঢাকা দূতাবাস

পাচারকারীদের হাত থেকে কোনোমতে উদ্ধার বা স্থানীয় প্রশাসনের হাতে আটক হওয়ার পর এই বাংলাদেশিদের ঠাঁই হয়েছিল লিবিয়ার তাজুড়া ডিটেনশন সেন্টারে। সেখানে দীর্ঘদিন বন্দি অবস্থায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং ন্যূনতম চিকিৎসাসেবার চরম সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের চরম মানবেতর ও নরককূল জীবনযাপন করতে হয়েছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে ভুক্তভোগীরা রাষ্ট্রদূতের কাছে তীব্র অনুশোচনা প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতে আর কখনো এমন আত্মঘাতী ও ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ পথ অবলম্বন না করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। রাষ্ট্রদূত তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং সান্ত্বনা প্রদান করেন। একই সঙ্গে তিনি প্রত্যাবাসনকারীদের দেশে ফিরে অতীতের ট্রমা ভুলে নতুন উদ্যমে, নতুন করে জীবন শুরু করার জোরালো আহ্বান জানান। 

রাষ্ট্রদূত তাদের অনুরোধ করেন, তারা যেন নিজ নিজ এলাকায় ফিরে লিবিয়ায় কাটানো তাদের এই দুঃসহ দুঃখ-কষ্ট, পাচারকারীদের নির্যাতন এবং অনিয়মিত অভিবাসনের ভয়াবহ পরিণতির বাস্তব অভিজ্ঞতা সবার সামনে তুলে ধরেন। এর মাধ্যমে গ্রামীণ ও মফস্বল অঞ্চলের অন্য কোনো সাধারণ মানুষ যেন দালালদের খপ্পরে পড়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশ গমনে উৎসাহিত না হয়, সে বিষয়ে জোর দেন তিনি।

অবৈধ অভিবাসনের সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করে রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন যে, অনিয়মিত বা অবৈধ অভিবাসন কেবল একজন ব্যক্তি ও তার পরিবারের আর্থিক ও সামাজিকভাবে অপূরণীয় ক্ষতিই করে না, বরং জাতীয় পর্যায়েও দেশের ভাবমূর্তির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে তিনি সবাইকে যেকোনো মূল্যে বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসনের পথ অনুসরণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপের পরামর্শ দেন। যেকোনো দেশে যাওয়ার পূর্বে সরকারি অনুমোদিত সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা, এজেন্সির তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা এবং কোনো অবস্থাতেই দালালচক্রের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন না করার জন্য তিনি আহ্বান জানান। 

উল্লেখ্য, লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস বর্তমানে মানবপাচারের শিকার বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনতে বড় আকারের উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। চলমান এই জুনের মাসেই আরও তিনটি বিশেষ ফ্লাইটে লিবিয়ার ‘গানফুদা’ ও ‘তাজুরা’ ডিটেনশন সেন্টার থেকে ধাপে ধাপে আরও ৫১৪ জন আটকে থাকা বাংলাদেশিকে দেশে প্রত্যাবাসনের জন্য দূতাবাস আইওএম-এর সাথে যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে। 

এদিকে, বিমানবন্দর ও বিভিন্ন সূত্রে মানবপাচারের শিকার হওয়া অভিবাসীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, বর্তমানে দালালদের ব্যবহৃত ‘এয়ারপোর্ট কন্ট্রাক্ট’ এবং ‘ওমরা ভিসার’ আড়ালে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপ যাত্রার যে চোরাপথ তৈরি হয়েছে, তা যদি অনতিবিলম্বে কঠোরভাবে বন্ধ করা না যায়, তবে আগামীতে আরও বহু বাংলাদেশি এভাবে প্রতারিত ও সর্বস্বান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়