মিয়ানমারের বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত গ্রামে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ৫৫
ছবি: সংগৃহীত
মিয়ানমারের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শান রাজ্যে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত একটি গ্রামে খনি ও পাথর উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত বিস্ফোরক মজুতস্থলে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। চীনের সীমান্তঘেঁষা নামখাম টাউনশিপের কাউং তাত গ্রামে স্থানীয় সময় গত রবিবার (৩১ মে) দুপুর ১২টার দিকে এই দুর্ঘটনা ঘটে। শক্তিশালী এই বিস্ফোরণে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৫৫ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও কয়েক ডজন মানুষ।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি ও স্থানীয় সংবাদ সংস্থা শ্বে ফি মায়ে নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে।
পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করেছে যে, নিহতদের মধ্যে ২৫ জন নারী এবং ৩০ জন পুরুষ রয়েছেন। ঘটনার পর পুরো এলাকায় উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে এবং স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরা ইতিমধ্যে ৪৬ জনের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। হতাহতদের সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যে এলাকায় এই ঘটনা ঘটেছে, সেটি বর্তমানে মিয়ানমারের সামরিক জান্তাবিরোধী অন্যতম শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন তাআং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির (টিএনএলএ) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঘটনার পর সংগঠনটির রাজনৈতিক শাখা পালাউং স্টেট লিবারেশন ফ্রন্ট (পিএসএলএফ/টিএনএলএ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করেছে।
বিবৃতিতে তারা এটিকে একটি ‘দুর্ঘটনাজনিত বিস্ফোরণ’ হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছে, খনি ও পাথর উত্তোলনের কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য মজুত রাখা বিস্ফোরক উপাদান থেকে অসাবধানতাবশত এই তীব্র বিস্ফোরণের সূত্রপাত হয়। এই ঘটনায় বিপুলসংখ্যক সাধারণ গ্রামবাসীর প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনায় গভীর শোক ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছে গোষ্ঠীটি।
একই সাথে টিএনএলএ জানিয়েছে যে, আবাসিক এলাকার কাছাকাছি এই ভয়াবহ বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে ইতিমধ্যে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে। যদি এই ঘটনার পেছনে কারো কোনো গাফিলতি বা দায়বদ্ধতা প্রমাণিত হয়, তবে তাকে কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে জরুরি ত্রাণ, চিকিৎসাসেবা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা।
আরও পড়ুন: চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের রাতে ফ্রান্সজুড়ে সহিংসতা, গ্রেফতার ৪১৬
বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, ঘটনাস্থল এবং এর আশপাশের কয়েক শ মিটার এলাকা মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের পাঠানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ও ছবিতে দেখা গেছে, বিস্ফোরণের উৎপত্তিস্থলে একটি বিশালাকার গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। আশপাশের শত শত ঘরবাড়ি ও ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে এবং দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া গাছপালা ও পুড়ে যাওয়া ইট-পাথরের স্তূপ থেকে দীর্ঘক্ষণ ধরে ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উড়তে দেখা গেছে।
স্থানীয় প্রশাসনের বরাতে জানা গেছে, বিস্ফোরণের আকস্মিক ধাক্কায় ও প্রচণ্ড শব্দে পুরো নামখাম টাউনশিপ কেঁপে ওঠে, যার ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অনেক বাসিন্দা প্রথমে মনে করেছিলেন এটি হয়তো সরকারি বাহিনীর কোনো বিমান হামলা। তীব্র বিস্ফোরণের পর চারদিকে মানুষের আর্তনাদ, নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে ছোটাছুটি এবং কান্নায় পুরো কাউং তাত গ্রামে এক হৃদয়বিদারক ও শোকার্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়া স্থানীয় এক বাসিন্দা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে লিখেছেন, বিস্ফোরণের তীব্রতায় তার নিজের ঘরবাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তিনি পায়ে সামান্য আঘাত পেয়েছেন। তিনি জানান, ঘটনার সময় তিনি শোবার ঘরে বসে মোবাইল ফোন দেখছিলেন এবং নুডলস খাচ্ছিলেন, যা নিছক ভাগ্যের জোরে তার জীবন বাঁচিয়ে দিয়েছে। যদি তিনি ওই সময় রান্নাঘরে থাকতেন, তবে হয়তো আজ বেঁচে থাকতেন না।
চারপাশের ভয়াবহতার বর্ণনা দিয়ে তিনি লেখেন, বিস্ফোরণের পর মুহূর্তেই মনে হচ্ছিল যেন পৃথিবীর সবকিছু শেষ হয়ে গেছে; মানুষ দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে চিৎকার করছিল এবং বাবা-মাকে ডাকছিল। তবে এই ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। আবাসিক এলাকার এত কাছাকাছি এবং ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে কীভাবে এমন বিপজ্জনক ও শক্তিশালী বিস্ফোরক মজুত করার অনুমোদন দেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ওই বাসিন্দা।
তিনি স্পষ্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই অবহেলার কারণে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবারগুলো এর পূর্ণাঙ্গ ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা না পাওয়া পর্যন্ত শান্ত হবে না।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ে লিপ্ত থাকা গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে টিএনএলএ অন্যতম প্রধান শক্তি। চীনের সাথে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শান রাজ্যের এই অঞ্চলে বর্তমানে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে তাদের একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। মিয়ানমারের এই ধরনের জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো মূলত তাদের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের অর্থায়নের জন্য নিজেদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের মূল্যবান খনিজ সম্পদ ও পাথর উত্তোলনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে। তবে যুদ্ধাবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির অভাবে এই অঞ্চলের খনি ও বিস্ফোরক মজুত কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থার চরম শৈথিল্য ও ঘাটতি রয়েছে। ফলে মিয়ানমারের এই সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে প্রায়ই পাহাড় ধস, খনি ধস কিংবা এই ধরনের মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটছে, যা দিন দিন সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি







