নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:৫৫, ২৪ মে ২০২৬

বিচার প্রক্রিয়ায় অ্যামনেস্টির হস্তক্ষেপ অনুচিত: চিফ প্রসিকিউটর

বিচার প্রক্রিয়ায় অ্যামনেস্টির হস্তক্ষেপ অনুচিত: চিফ প্রসিকিউটর

ছবি: সংগৃহীত

২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুই সাংবাদিককে গ্রেফতারের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিবৃতি ও অবস্থানকে ‘অনুচিত’ এবং ‘আইনগতভাবে সুযোগহীন’ বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। চলমান একটি বিচার প্রক্রিয়ায় যেকোনো ধরনের বাইরের হস্তক্ষেপ ট্রাইব্যুনালের স্বাধীন তদন্ত সংস্থাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। 

রবিবার (২৪ মে) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস্থ নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর দেশের চলমান বহুল আলোচিত মামলার তদন্তের অগ্রগতি, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্তের বাস্তবতা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর বিচারিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই চিফ প্রসিকিউটর শাপলা চত্বরের মামলায় একাত্তর টেলিভিশনের কারাবন্দি সাংবাদিক ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবুকে গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। 

তিনি জানান, ট্রাইব্যুনালের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এই দুই সাংবাদিককে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে এবং মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে তাদের রিমান্ড বা জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হতে পারে। সম্প্রতি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক স্মৃতি সিং এক বিবৃতিতে এই দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে তাদের পেশাগত কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত দাবি করে তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। 

অ্যামনেস্টির এই বিবৃতির জবাবে চিফ প্রসিকিউটর স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আমরা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিক্রিয়া সরাসরি দেখিনি। তবে আমাদের একটি চলমান এবং সম্পূর্ণ স্বাধীন বিচার প্রক্রিয়ায় তাদের বা অন্য কোনো মানবাধিকার সংগঠনের এভাবে হস্তক্ষেপ করা মোটেও উচিত নয়। এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সম্পূর্ণ নিজস্ব এখতিয়ার এবং তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়াই আইনি নিয়ম। 

ভবিষ্যতে আরও কোনো সাংবাদিককে এই মামলায় গ্রেফতার করা হবে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে আশ্বস্ত করে বলেন, অহেতুক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে কোনো ধরনের হয়রানি করা হবে না; তবে তদন্তে যাদেরই সুনির্দিষ্ট অপরাধের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদের প্রত্যেককেই আইনের মুখোমুখি হতে হবে।

রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে কোনো তদন্ত চলছে কি না অথবা দলটিকে নিষিদ্ধ করার কোনো প্রক্রিয়া চলমান কি না গণমাধ্যমকর্মীদের এমন একাধিক প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম জানান, এ বিষয়ে এই মুহূর্তে তার কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট ধারণা বা প্রত্যক্ষ তথ্য নেই। 

আরও পড়ুন: রামিসা হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল আজ

তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের বিরুদ্ধে বর্তমানে তদন্ত চলছে কি না তা কেবল তদন্ত সংস্থার সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই বলতে পারবেন। চিফ প্রসিকিউটরের দপ্তর বা প্রসিকিউশন টিমের কাছে এ সংক্রান্ত কোনো অগ্রগতির তথ্য এখনো আসেনি। 

বিষয়টি পরিষ্কার করে তিনি বলেন, এ নিয়ে আমার ব্যক্তিগত কোনো ধারণা নেই। যখন এমন কোনো তদন্তের আনুষ্ঠানিক তথ্য আমরা জানতে পারব, তখন নিশ্চিতভাবেই দেশের আপামর জনগণ ও গণমাধ্যমকে তা অবহিত করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর গত বছরের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুম, খুন ও অপহরণের মামলাগুলোর সামগ্রিক পরিসংখ্যান এবং সর্বশেষ অগ্রগতি চিত্র তুলে ধরেন। 

তিনি জানান, জুলাই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে সর্বমোট ১৫০টি মামলার তদন্ত কার্যক্রম অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ৩১টি মামলার তদন্ত কার্যক্রম ইতিমধ্যে একেবারে শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা দ্রুতই আলোর মুখ দেখবে। এছাড়া ২২টি মামলার বিচারিক কার্যক্রম পুরোদমে চলছে এবং ২টি মামলা সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া শেষে বর্তমানে চূড়ান্ত রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (CAV) রয়েছে। 

তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত অপরাধের সঙ্গে যার নামই জড়িয়ে থাকবে, আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত চালানো হবে, কিন্তু কোনো নিরপরাধ নাগরিক যেন বিচারের নামে হেনস্থার শিকার না হন সে বিষয়ে প্রসিকিউশন টিম সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

এ সময় দেশের দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং পূর্ববর্তী ঝুলে থাকা মামলাগুলোর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন চিফ প্রসিকিউটর। তিনি ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব গ্রহণের পর পূর্বের নিস্ক্রিয় বা অসম্পূর্ণ থাকা ৭টি মামলা নতুন করে অধিকতর ও পুনরায় তদন্তের জন্য তদন্ত সংস্থায় পাঠিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। 

অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তিনি জানান, এই ৭টি মামলার যাবতীয় তদন্ত গুটিয়ে এনে আগামী পবিত্র ঈদুল আজহার পর আদালতে আনুষ্ঠানিক চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করা হতে পারে। একই সাথে দেশের চাঞ্চল্যকর সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্তের দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে গভীর দুঃখ প্রকাশ করে আমিনুল ইসলাম বলেন, এতগুলো বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল না হওয়া অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও বেদনাদায়ক। 

পাশাপাশি, বহুল আলোচিত শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দ্রুত আইনি সমাপ্তির ওপর জোর দিয়ে তিনি জানান, এই মামলাটি যাতে উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট) অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা যায়, সে লক্ষ্যে প্রসিকিউশন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগকে বিশেষ নজর রাখার এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়