রাজধানীতে অবৈধ পশুর হাট, বাড়ছে নিরাপত্তা শঙ্কা
ফাইল ছবি
আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতারাতি গড়ে উঠেছে বেশ কিছু অবৈধ ও অস্থায়ী পশুর হাট। বিশেষ করে মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা নগর এলাকায় বসা এসব হাটে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় গরু ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে চরম নিরাপত্তা শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এসব হাট বসানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশও প্রথম দিকে এসবের খোঁজ জানত না। তবে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসার পরপরই তৎপর হয়ে উঠেছে পুলিশ। ইতিমধ্যে তেজগাঁও বিভাগের পুলিশি অভিযানে এসব অস্থায়ী হাট উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অবৈধ প্রচেষ্টা রুখে দিতে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা নগর থানা এলাকার বিভিন্ন অলিগলি, ফাঁকা মাঠ ও প্রধান সড়কের পাশে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এসব অস্থায়ী পশুর হাট বসানো হয়েছিল। এর মধ্যে রায়েরবাজার, বেড়িবাঁধ ভাঙা মসজিদের পাশে সিটি করপোরেশনের জনতা বাজার এলাকা, চন্দ্রীমা মডেল টাউন, ঈদগাঁ মাঠ, আদাবর মনসুরাবাদ, নবোদয় বাজার, সুনিবিড় হাউজিং সোসাইটি এবং শেরেবাংলা নগর এলাকার বেশ কয়েকটি স্থানে প্রকাশ্যেই গরুর হাট জমিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা গরু ব্যবসায়ীরা এসব হাটে অবর্ণনীয় নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছিলেন। কোনো ধরনের ইজারা বা বৈধ অনুমতি না থাকায় এসব হাটে জেনারেটর, আলোর ব্যবস্থা, কিংবা জাল টাকা শনাক্তকরণ মেশিনের মতো ন্যূনতম কোনো সুযোগ-সুবিধাও ছিল না। ফলে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা লেনদেনের এই মৌসুমে ব্যবসায়ীরা কীভাবে নিরাপদে বাড়ি ফিরবেন, তা নিয়ে জনমনে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দেয়।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক ঘটনাটি ঘটেছে মোহাম্মদপুরের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে। সেখানকার ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘জামিয়া ইসলামিয়া বাইতুল ফালা মাদ্রাসা’র ভেতরের খালি জায়গায় রীতিমতো বাঁশ-খুঁটি গেঁড়ে গরুর হাট বসানোর অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি মাদ্রাসার পবিত্রতা ও শিক্ষার পরিবেশ ক্ষুণ্ন করে এই হাট বসান। মাদরাসার ভেতরে পশুর হাটের একটি ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে তা ভাইরাল হয় এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা প্রকাশ করেন। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কীভাবে পশুর হাট পরিচালিত হতে পারে, তা নিয়ে সচেতন মহলে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
আরও পড়ুন: ঈদযাত্রা নিরাপদ ও শৃঙ্খলিত ভ্রমণে ডিএমপির নির্দেশনা
স্থানীয় সচেতন বাসিন্দাদের মতে, মোহাম্মদপুর ও এর আশপাশের এলাকাগুলো এমনিতেই অপরাধপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরেই এই এলাকায় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইকারীদের এক ধরনের উপদ্রব রয়েছে। এমন একটি সংবেদনশীল এলাকায় প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া এত বড় বড় পশুর হাট বসে যাওয়া কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এলাকাভিত্তিক কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা নিজেদের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এবং দলীয় পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এসব অস্থায়ী হাট থেকে লাখ লাখ টাকা চাঁদা হাতিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করছিলেন।
এই পরিস্থিতিতে সচেতন পেশাজীবী সমাজ প্রশ্ন তুলেছেন, কোনো হাটে যদি বড় ধরনের ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটত এবং কোনো গরু ব্যবসায়ী যদি সর্বস্বান্ত হতেন, তবে তার দায়ভার কে নিত? সিটি করপোরেশন নাকি স্থানীয় প্রশাসন?
এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, রাজধানীতে পূর্ব নির্ধারিত টেন্ডারের বাইরে নতুন করে কোনো অস্থায়ী পশুর হাটের অনুমতি দেওয়া হয়নি। যেসব হাট যথাযথ প্রক্রিয়ায় টেন্ডারের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হয়েছে, কেবল তারাই বৈধভাবে হাট পরিচালনা করতে পারবে। এর বাইরে যেকোনো হাটই সম্পূর্ণ অবৈধ।
এদিকে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তেজগাঁও বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এডিসি) ইবনে মিজান নিউজবাংলাদেশ ডটকমকে জানান, গণমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য পাওয়ার পরপরই পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, মোহাম্মদপুরসহ বেশ কিছু এলাকায় অস্থায়ী পশুর হাট বসার তথ্য পাওয়ামাত্রই আমরা সেখানে পুলিশ পাঠিয়েছি। ইতিমধ্যেই সবকটি অস্থায়ী ও অবৈধ পশুর হাট উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আপাতত কোথাও কোনো অবৈধ হাট নেই। এরপরও যদি কেউ আইন অমান্য করে কিংবা জোরপূর্বক পশুর হাট বসানোর চেষ্টা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পরিষ্কার বার্তা হচ্ছে রাজধানীর কোথাও কোনো অবৈধ বা অস্থায়ী পশুর হাট বসতে দেওয়া হবে না।
পশুর হাটের সার্বিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে এবং কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সেজন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং সিটি করপোরেশন যৌথভাবে নজরদারি বাড়িয়েছে। যেকোনো ধরনের অবৈধ হাটের বিরুদ্ধে এই উচ্ছেদ অভিযান ও কঠোর আইনি তৎপরতা অব্যাহত থাকবে বলে জানা গেছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








